পদ্মায় বাসডুবি: কুমারখালী থেকে যাত্রা করা বাসে যাত্রী ছিল অর্ধশত
বুধবার দুপুরে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে মাত্র ছয়জন যাত্রী নিয়ে রাজধানী ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’ নামের যাত্রীবাহী বাসটি। পথিমধ্যে বিভিন্ন স্ট্যান্ড থেকে যাত্রী তোলার পর রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পৌঁছানোর আগেই বাসটিতে যাত্রী সংখ্যা দাঁড়ায় অন্তত ৫০ জনে। সেই পূর্ণবোঝাই বাসটিই এখন পদ্মা নদীর অতল গহ্বরে নিমজ্জিত।
প্রতিদিনের মতো নির্ধারিত সময় বেলা ২টা ২০ মিনিটে কুমারখালী পৌর বাস টার্মিনাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে চাকা ঘোরে সৌহার্দ্য পরিবহনের। শুরুর যাত্রায় যাত্রী সংখ্যা কম থাকায় চালক ও সহকারীর লক্ষ্য ছিল পথিমধ্যে বিভিন্ন কাউন্টার থেকে যাত্রী পূর্ণ করা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাসটি আলাউদ্দিন নগর, পাংশা ও রাজবাড়ী মোড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট থেকে একের পর এক যাত্রী তোলে।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পৌঁছানোর পর ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় থাকা বা ফেরিতে ওঠার প্রক্রিয়ায় থাকা অবস্থায় যান্ত্রিক ত্রুটি বা অন্য কোনো কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি উত্তাল পদ্মায় তলিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মুহূর্তের মধ্যে চোখের পলকে বাসটি পানিতে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় চারদিকে আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় ডুবুরি দল ও ফায়ার সার্ভিস তৎক্ষণাৎ উদ্ধারকাজ শুরু করলেও তীব্র স্রোত ও পানির গভীরতার কারণে প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়।
কাউন্টার মাস্টারের জবানবন্দি ও যাত্রী সংকট
কুমারখালী বাস টার্মিনালের কাউন্টার মাস্টারের দেওয়া তথ্যমতে, বাসটি যখন টার্মিনাল ত্যাগ করে তখন যাত্রী ছিল মাত্র ছয়জন। কিন্তু লাভজনক ট্রিপ নিশ্চিত করতে পথিমধ্যে ‘ওয়েবিল’ বা লোকাল যাত্রী তোলার প্রবণতা অনেক সময় ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। কাউন্টার মাস্টার নিশ্চিত করেছেন যে, দৌলতদিয়া পৌঁছানোর আগে বিভিন্ন স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠানোর পর বাসে কমপক্ষে ৫০ জন আরোহী ছিলেন।
এই তথ্যটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ বাসের ভেতর ঠিক কতজন যাত্রী আটকা পড়ে আছেন তার সঠিক হিসাব পেতে বেগ পেতে হচ্ছে প্রশাসনকে। অনেক যাত্রী টিকেট ছাড়াই বাসে ওঠায় তাদের পরিচয় শনাক্ত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনার সারসংক্ষেপ ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
-
বাসের নাম: সৌহার্দ্য পরিবহন।
-
যাত্রার শুরু: কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌর বাস টার্মিনাল (বেলা ২:২০ মিনিট)।
-
প্রাথমিক যাত্রী: ৬ জন (টার্মিনাল থেকে)।
-
সম্ভাব্য মোট যাত্রী: ৫০ জনের বেশি (কাউন্টার মাস্টারের তথ্যমতে)।
-
দুর্ঘটনাস্থল: দৌলতদিয়া ফেরিঘাট সংলগ্ন পদ্মা নদী।
-
উদ্ধার তৎপরতা: ফায়ার সার্ভিস ও নৌ-পুলিশের যৌথ অভিযান চলমান।
নিরাপত্তার ঘাটতি না কি দুর্ভাগ্য?
পদ্মা পাড়ের এই নৌ-রুটে ফেরি পারাপারের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং চালকদের তাড়াহুড়ো নিয়ে আগেও অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, বাসটি ফেরিতে ওঠার সময় সম্ভবত ব্রেক ফেল করেছিল অথবা চালকের অসতর্কতা ছিল। তবে যাত্রী বোঝাই করার যে নেশা পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে থাকে, তা অনেক সময় নিরাপত্তার প্রশ্নকে গৌণ করে দেয়। বিশেষ করে লোকাল যাত্রী তোলার ফলে বাসের প্রকৃত ধারণক্ষমতা এবং যাত্রীদের সঠিক তালিকা না থাকায় উদ্ধার অভিযানে জটিলতা বাড়ছে।
নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনরা এখন নদীর পাড়ে ভিড় করছেন। কুমারখালী ও কুষ্টিয়া জুড়ে বিরাজ করছে শোকের ছায়া। যারা মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে হাসিমুখে বাসে উঠেছিলেন, তারা এখন নিছক নিখোঁজের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন।





