ঢামেকে চিকিৎসাসামগ্রীর তীব্র সংকট, বিকল হিমাগারে পচে যায় ২০ মরদেহ
দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে দেখা দিয়েছে নানা ধরনের চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট। জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়ার্ডে গজ, ব্যান্ডেজ, প্লাস্টার ব্যান্ডেজ, ড্রেসিং সামগ্রী ও অ্যান্টিসেপটিক দ্রব্যের ঘাটতির কারণে রোগী ও তাদের স্বজনদের অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপকরণ বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে।
এর মধ্যেই হাসপাতালের মর্গে মরদেহ সংরক্ষণের হিমাগার বিকল হয়ে যাওয়ার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা নবজাতকসহ প্রায় ২০টি মরদেহ পচে যাওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। এতে মর্গ এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়।
ঢামেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২ হাজার ৬০০ শয্যার অনুমোদন থাকলেও নিয়মিতভাবে সাড়ে তিন হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। প্রতিদিন জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন প্রায় দেড় হাজার মানুষ। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩৫০ জন সড়ক দুর্ঘটনা, সংঘর্ষ, ছুরিকাঘাতসহ বিভিন্ন ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায় ভর্তি হন। এছাড়া প্রতিদিন প্রায় ৫০০ রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মঙ্গলবার হাসপাতালের ১১৫ নম্বর অর্থোপেডিক ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক সিনিয়র স্টাফ নার্স জানান, গজ, ব্যান্ডেজ ও প্লাস্টার ব্যান্ডেজের তীব্র সংকট চলছে। ক্ষতস্থান পরিষ্কারের অ্যান্টিসেপটিক তরল এবং ড্রেসিং সামগ্রীরও ঘাটতি রয়েছে। সংকটের মধ্যেও চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীদের স্বজনদের বাইরে থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের কর্মচারী রামু দাস জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ৪০ মরদেহ সংরক্ষণক্ষমতাসম্পন্ন হিমাগারটি বিকল ছিল। এ সময় সেখানে থাকা অজ্ঞাতনামা নবজাতকসহ প্রায় ২০টি মরদেহ পচে যায়। পরে দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হলে হিমাগারটি আবার চালু করা সম্ভব হয়।
তিনি বলেন, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, ঢাকা রেলওয়ে থানা ও বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা নবজাতকসহ কয়েকটি মরদেহ বর্তমানে মেরামত করা হিমঘরে রাখা হয়েছে। এর আগে সেগুলো লাশকাটা ঘরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
হিমাগার বিকল থাকায় সময়মতো সংরক্ষণ সম্ভব না হওয়ায় অন্তত ১৫টি মরদেহ দাফনের জন্য আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আরও কয়েকটি মরদেহ একই প্রক্রিয়ায় দাফনের প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন (আরএস) ডা. মোস্তাক আহমেদ বলেন, অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণেই কিছু চিকিৎসাসামগ্রী সাময়িক সংকটে পড়েছে। প্লাস্টার ব্যান্ডেজ, ক্ষত সেলাইয়ের সুতা, ড্রেসিং উপকরণ ও কিছু অ্যান্টিসেপটিক দ্রব্যের ঘাটতি রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় ওষুধের বড় ধরনের কোনো সংকট নেই। ব্যথানাশক ও গ্যাস্ট্রিকের ইনজেকশন পর্যাপ্ত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে যেসব সামগ্রী সাময়িকভাবে পাওয়া যাচ্ছে না, প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীদের বাইরে থেকে সংগ্রহের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, অর্থবছরের শেষ দিকে সাময়িকভাবে কিছু সংকট তৈরি হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী কেনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আগামী দুই-এক দিনের মধ্যেই নতুন সরবরাহ হাসপাতালে পৌঁছে যাবে।
স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় এই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি ও মর্গ ব্যবস্থাপনার এমন চিত্র জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগীর ক্রমবর্ধমান চাপ বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি ছাড়া এ ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসতে পারে।





