এক পৃষ্ঠার চুক্তিতেই কি থামবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ!
মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাসা পরিস্থিতিতে অবশেষে কি দেখা মিলবে শান্তির আলোকবর্তিকা, থামবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ? দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও স্নায়ুযুদ্ধের ইতি টানতে ঐতিহাসিক এক সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। হোয়াইট হাউজ সূত্র জানাচ্ছে, দুই পক্ষই এখন এক পৃষ্ঠার একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষরের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা বড় কোনো যুদ্ধের আশঙ্কা আপাতত নাকচ করে দিতে পারে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সম্পর্ক গত কয়েক দশকে এমন নাটকীয় মোড় আর কখনও নেয়নি। মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ দুই কর্মকর্তা এবং আলোচনার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে অবগত একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, হোয়াইট হাউজ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু শক্তিশালী খসড়া তৈরি করেছে।
এই এক পৃষ্ঠার দলিলে মূলত চলমান সরাসরি সংঘাত বন্ধ এবং ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ পরমাণু চুক্তিতে ফেরার রূপরেখা বা ফ্রেমওয়ার্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আগামী ৪৮ ঘণ্টা। জানা গেছে, খসড়া চুক্তির বেশ কিছু স্পর্শকাতর পয়েন্টে তেহরানের চূড়ান্ত উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে বাইডেন প্রশাসন। যদিও কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে এখনও কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খোলেনি, তবে নেপথ্যের কারিগররা বলছেন, যুদ্ধের দামামা বাজার পর থেকে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ এই প্রথম সমঝোতার এত নিকটবর্তী হতে পেরেছে।
কৌশলী কূটনীতি নাকি সময়ের দাবি?
বিশ্লেষকদের মতে, এই এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারকটি হতে যাচ্ছে একটি ‘ফায়ার এক্সটিংগুইশার’ বা অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রের মতো। এটি হয়তো রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান করবে না, কিন্তু চলমান উত্তেজনাকে হিমাঙ্কে নামিয়ে আনতে সাহায্য করবে। গত কয়েক বছরে ড্রোন হামলা, পাল্টাপাল্টি স্যাংশন এবং পরমাণু প্রকল্প ঘিরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে সেখানে একটি স্থিতাবস্থা (Status Quo) ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্কিন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “আমরা চাচ্ছি না মধ্যপ্রাচ্য আরও একটি অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের গভীরে তলিয়ে যাক। তেহরানও অর্থনৈতিক চাপের মুখে একটি সম্মানজনক প্রস্থান খুঁজছে। এই ছোট দলিলটি বড় ধরনের আলোচনার দরজা খুলে দিতে পারে।”
চুক্তির সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো:
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে এই চুক্তির কিছু মূল বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো:
-
সংঘাত বিরতি: দুই পক্ষই একে অপরের ভূখণ্ড বা স্বার্থে সরাসরি হামলা চালানো থেকে বিরত থাকবে।
-
পরমাণু আলোচনার কাঠামো: ভবিষ্যতে জেসিপিওএ (JCPOA) বা অনুরূপ বড় চুক্তিতে ফেরার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট টাইমলাইন বা সময়সূচি তৈরি করা।
-
প্রক্সি নিয়ন্ত্রণ: আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে তেহরানের মৌখিক আশ্বাস।
-
জরুরি যোগাযোগ: ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি সরাসরি হটলাইন সচল রাখা।
একটি নতুন অধ্যায়ের হাতছানি
এই সম্ভাব্য চুক্তিটি কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের জন্য নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তেহরান থেকে সবুজ সংকেত আসে, তবে এটি হবে একুশ শতকের অন্যতম সেরা কূটনৈতিক সাফল্য। তবে ইতিহাস বলছে, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে আস্থার সংকট এতই গভীর যে, শেষ মুহূর্তে যেকোনো ছোট ঘটনাও সব হিসেব উল্টে দিতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, এই এক পৃষ্ঠার কাগজটি কেবল কালি আর কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির নতুন মানচিত্র আঁকবে—তা নির্ভর করছে দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে ওয়াশিংটনের ওভাল অফিস আর তেহরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের দিকে।





