ফিচার স্বাস্থ্য

ঈদের ভারী খাবারে ‘মেটাবলিক শক’, বাড়ছে স্ট্রোকের আশঙ্কা

ঈদের ভারী খাবারে ‘মেটাবলিক শক’, বাড়ছে স্ট্রোকের আশঙ্কা

এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের দিনে হঠাৎ ভারী ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণে শরীরে দেখা দিচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলছেন, খাদ্যাভ্যাসের এই আকস্মিক পরিবর্তন শুধু হজমের সমস্যা নয়, বরং রক্তচাপ বৃদ্ধি ও স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে।

রমজানজুড়ে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে মানবদেহ একটি নির্দিষ্ট ছন্দে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এ সময় বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম তুলনামূলক ধীরগতিতে চলে এবং শরীর শক্তি সঞ্চয়ের মোডে থাকে। কিন্তু ঈদের দিন হঠাৎ করে মিষ্টি, গরু বা খাসির মাংস, তেল-চর্বিযুক্ত খাবার বেশি পরিমাণে খেলে এই ছন্দ ভেঙে যায়। ফলে শরীর এক ধরনের ‘মেটাবলিক শক’-এর মধ্যে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে দেয়, যা ইনসুলিনের ভারসাম্য নষ্ট করে। অন্যদিকে, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বি শরীরের ভেতরে পানি ধারণ বাড়িয়ে রক্তচাপ দ্রুত বৃদ্ধি করে। এই পরিবর্তন হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্কের ওপর সরাসরি চাপ ফেলে।

ঈদের খাবারে লবণ ও চর্বিযুক্ত মাংসের আধিক্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি করে উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য। চিকিৎসকেরা বলছেন, যাঁদের আগে থেকেই হাইপারটেনশন রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে গেলে ‘হেমোরেজিক স্ট্রোক’—অর্থাৎ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়। আবার অতিরিক্ত চর্বি রক্তনালিতে জমে ব্লকেজ সৃষ্টি করে ‘ইস্কেমিক স্ট্রোক’-এর কারণ হতে পারে।

ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের এক চিকিৎসক জানান, “ঈদের পরবর্তী কয়েক দিনে স্ট্রোকের রোগী বাড়তে দেখা যায়। অনেকেই প্রথমে মাথাব্যথা বা দুর্বলতাকে সাধারণ ক্লান্তি ভেবে অবহেলা করেন, যা পরে মারাত্মক রূপ নেয়।”

স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি। হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া কিংবা শরীরের একপাশ অবশ হয়ে যাওয়া—এসব উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এছাড়া শুধু স্নায়ুতন্ত্র নয়, হঠাৎ ভারী খাবার গ্রহণে হজমতন্ত্রেও সমস্যা দেখা দেয়। গ্যাস্ট্রিক, অ্যাসিডিটি, বমিভাব কিংবা ডায়রিয়ার মতো সমস্যাও বাড়তে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি ও ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।

মূল বিষয়গুলো এক নজরে:

  • দীর্ঘ রোজার পর হঠাৎ ভারী খাবার শরীরে মেটাবলিক শক তৈরি করে
  • অতিরিক্ত লবণ ও চর্বি রক্তচাপ দ্রুত বাড়িয়ে দেয়
  • উচ্চ রক্তচাপ থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়
  • মিষ্টিজাতীয় খাবার রক্তে গ্লুকোজের ভারসাম্য নষ্ট করে
  • স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি

পুষ্টিবিদেরা পরামর্শ দিচ্ছেন, ঈদের দিনেও খাবার গ্রহণে সংযম বজায় রাখা উচিত। একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান এবং ফলমূল ও সবজি অন্তর্ভুক্ত করা শরীরের জন্য নিরাপদ। পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ সেবনকারীদের তাদের চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার