ইসলামাবাদ শান্তি আলোচনা: তেহরানের নীরবতায় কাটছে না ধোঁয়াশা
ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার হাই-প্রোফাইল শান্তি আলোচনায় ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে এই সংলাপে বসার ব্যাপারে তেহরানের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক সবুজ সংকেত মেলেনি।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করা হলেও ইরানের এই নীরবতা ভূ-রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
তেহরানের মৌনতা ও ইসলামাবাদের তৎপরতা
মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এক বার্তায় পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বর্তমান পরিস্থিতির একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, পাকিস্তান সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ‘ইসলামাবাদ শান্তি আলোচনা’ বা ‘ইসলামাবাদ পিস টকস’-এ যোগ দেওয়ার বিষয়ে ইরান কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনাটি দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ নিরসনে ইসলামাবাদ একটি ‘সেতুবন্ধন’ হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আলোচনার টেবিল প্রস্তুত থাকলেও প্রধান এক পক্ষ অর্থাৎ ইরানের পক্ষ থেকে সাড়া না আসায় আপাতত ঝুলে আছে এই কূটনৈতিক উদ্যোগ।
নেপথ্যে কি অন্য কোনো সমীকরণ?
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে বসার ক্ষেত্রে ইরান বরাবরই অত্যন্ত সতর্ক পা ফেলে। বিশেষ করে পারমাণবিক চুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতির বিষয়ে তেহরানের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। দ্বিতীয় দফার এই আলোচনায় কোন কোন এজেন্ডা প্রাধান্য পাবে, তা নিয়ে হয়তো ইরানের অভ্যন্তরে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের জন্য এই মধ্যস্থতা অত্যন্ত মর্যাদার বিষয়। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণে তারা বদ্ধপরিকর। কিন্তু তেহরানের এই ‘কৌশলী নীরবতা’ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা হয়তো আলোচনার পরিবেশ বা মার্কিন প্রতিনিধি দলের প্রস্তাবনা নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছে না। অথবা তারা এমন কোনো নিশ্চয়তা চাইছে যা পাকিস্তান বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনো দেওয়া সম্ভব হয়নি।
আলোচনার বর্তমান প্রেক্ষাপট:
সামগ্রিক পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে নিচের বিষয়গুলো লক্ষ্য করা জরুরি:
-
যোগাযোগের মাধ্যম: পাকিস্তান তার প্রতিবেশী ইরানের সাথে কূটনৈতিক ও আনঅফিসিয়াল—উভয় পথেই আলোচনার চেষ্টা করছে।
-
মার্কিন অবস্থান: যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনায় অংশগ্রহণে আগ্রহী থাকলেও তারা ইরানের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।
-
আগের অভিজ্ঞতা: প্রথম দফার আলোচনায় কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও অমীমাংসিত ইস্যুগুলো ছিল পাহাড় সমান।
-
সময়সীমা: মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত কোনো জবাব না আসায় পরবর্তী সূচি নির্ধারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
-
আঞ্চলিক প্রভাব: ইরান যদি শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যায়, তবে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি প্রক্রিয়ার এই নতুন প্রচেষ্টা বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।
ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও পাকিস্তানের ভূমিকা
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের সরকার বর্তমানে অর্থনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে বেশ চাপে রয়েছে। এই অবস্থায় বিশ্বমঞ্চে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য তাদের জন্য অক্সিজেন হিসেবে কাজ করতে পারতো। আতাউল্লাহ তারার তার পোস্টে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও কূটনৈতিক রীতিনীতিতে ‘দেরি হওয়া’ মানেই সবসময় ‘না’ হওয়া নয়; বরং এটি দর কষাকষির একটি অংশও হতে পারে।
ইসলামাবাদ এখন কেবল একটি বার্তার অপেক্ষায়। তেহরান কি শেষ মুহূর্তে তাদের প্রতিনিধি পাঠাবে, নাকি আলোচনার টেবিলে একটি চেয়ার খালিই পড়ে থাকবে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। ইরান যদি আসে, তবে তা হবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এক বড় চমক। আর যদি না আসে, তবে ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কের বরফ গলানোর প্রক্রিয়া আবারও দীর্ঘসূত্রিতায় পড়বে।





