বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কিংবা মৌখিক সমর্থনের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নির্বিচার শাস্তি দেওয়া হচ্ছে বলে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি সুনির্দিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানিয়েছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের নূন্যতম সুযোগ না দিয়ে শুধুমাত্র ভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
মূল তথ্যাবলি (Key Highlights)
- এইচআরডব্লিউর দাবি: দেশের ২০টিরও বেশি স্বনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক ও বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে।
- তদন্তের পরিধি: অন্তত ৪০৪ জন প্রগতিশীল ও আওয়ামীপন্থী শিক্ষককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপে থাকার কারণে দীর্ঘ তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
- অধিকার লঙ্ঘন: শতাধিক শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার মূল সনদ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে এবং ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- যথাযথ প্রক্রিয়ার অভাব: আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে বরখাস্ত বা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করার কারণে আইনি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক প্রতিশোধ
লন্ডন থেকে প্রকাশিত এই বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উল্লেখ করে, ২০২৪ সালে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের শিক্ষা অঙ্গনগুলোতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী এই বিষয়ে এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মুক্ত রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ভিন্নমতের এক সুদীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেন যে, সুস্থ রাজনৈতিক আলোচনাকে কেবল স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্নরাই ভয় পেতে পারে, কোনো গণআন্দোলনের মাধ্যমে গঠিত গণতান্ত্রিক সরকার নয়।
সংস্থাটি জানায়, ক্ষমতা বদলের সাথে সাথেই যদি পূর্ববর্তী রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের ওপর এভাবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশোধের খড়গ নেমে আসে, তবে তা দেশের বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকার সুরক্ষার চিত্রকে চরমভাবে প্রশ্নбиদ্ধ করবে। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী হওয়ার অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেভাবে ঢালাও ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা অতীতে ঘটে যাওয়া দমন-পীড়নের ধারাবাহিকতারই এক কুৎসিত পুনরাবৃত্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নির্বিচার শাস্তি ও আইনি প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই মানবাধিকার সংস্থাটির সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্তত ২০টি বড় সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের জোরপূর্বক ক্লাসে যেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং গবেষণামূলক কাজ থেকে বিরত রাখা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যথাযথ administrative তদন্ত কমিটি গঠন ছাড়াই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪৪ জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এই চরম সংকটজনক পরিস্থিতিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নির্বিচার শাস্তি দেওয়ার এই প্রক্রিয়াটি কেবল উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি করছে না, অথচ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। অনেক শিক্ষক দাবি করেছেন, কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই শুধুমাত্র অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।
শিক্ষার্থীদের শিক্ষা অধিকার ও সনদ বাতিল
শিক্ষক সমাজের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপরেও এই প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থার ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এইচআরডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে শতাধিক শিক্ষার্থীর পরীক্ষার চূড়ান্ত পাসের সনদ আটকে রাখা হয়েছে এবং তাদের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম থেকে জোরপূর্বক বিচ্যুত করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের সাথে সম্পৃক্ততার ওজুহাতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন এভাবে ধ্বংস করা মানবাধিকার পরিপন্থী কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অবিলম্বে এই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সরকারকে অবিলম্বে এই অন্যায্য এবং বৈষম্যমূলক তদন্ত প্রক্রিয়া স্থগিত করার পরামর্শ দিয়েছে। তারা মনে করে, প্রতিটি নাগরিকের তার শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বিশ্বাস বজায় রাখার আইনি অধিকার রয়েছে এবং সেই অধিকার কেড়ে নিয়ে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই মুক্তচিন্তার চারণভূমি হয়ে উঠতে পারে না।