জাতীয় বিশ্ব সংযোগ শীর্ষ দুই

তোষণমূলক পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে: জহরত আদিব

সংসদীয় কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী
মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পর বিভিন্ন দেশের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্কে না গিয়ে তৎকালীন সরকারের অনুসৃত নতজানু পররাষ্ট্রনীতি আমাদের দেশকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, একটি সদ্য স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান না দেওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমরা শুরুতে যে অমিত সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিলাম, তা থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে।
  • মূল সংকট: মহান স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক কূটনীতি বজায় রাখতে ব্যর্থতা।
  • সুযোগ হাতছাড়া: মুক্তিযুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার যে জোয়ার তৈরি হয়েছিল, তার কৌশলগত সুবিধা নেওয়া যায়নি।
  • অর্থনৈতিক ধাক্কা: সঠিক ও দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির অভাবে তৎকালীন সময়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক সহায়তা ও অনুদান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
  • আয়োজক সংস্থা: ঢাকার শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ এই বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করে। 
তোষণমূলক কূটনীতির ঐতিহাসিক খেসারত
রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজ’-এর এক অনুষ্ঠানে জহরত আদিব চৌধুরী এই মন্তব্যগুলো করেন। ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী এক দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির তুলনামূলক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এই সেমিনারে অংশ নিয়ে তিনি দেশের প্রাথমিক কূটনৈতিক ইতিহাসের নানা অসংগতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতা লাভের পর বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তিগুলো যখন বাংলাদেশকে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছিল, ঠিক তখনই আমাদের সামনে একটি স্বাবলম্বী পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছিল। 
কিন্তু সেই সময় ভারসাম্য রক্ষার বদলে তোষণমূলক নীতিকে বেছে নেওয়ার ফলে একটি বড় কৌশলগত বিপর্যয় ঘটে। সঠিক ও সময়োপযোগী কোনো পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন না করার কারণে বিশ্বমঞ্চের অনেক প্রভাবশালী অংশীদার আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল তৎকালীন বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর।
নতজানু পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সাহায্য বন্ধের নেপথ্য কারণ
সেমিনারে অংশ নিয়ে এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন কীভাবে একটি ত্রুটিপূর্ণ ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ধারণাকে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। তিনি উল্লেখ করেন, সঠিক দ্বিপাক্ষিক সমীকরণ বজায় রাখতে না পারায় অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়ে অনেক প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা এবং জরুরি ত্রাণ বরাদ্দ আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এই কূটনৈতিক ব্যর্থতার ফলশ্রুতিতেই দেশকে পরবর্তীকালে নজিরবিহীন দুর্ভিক্ষ এবং চরম সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
বর্তমান যুগে সেই ঐতিহাসিক ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন নীতিনির্ধারকরা। বৈশ্বিক মেরুকরণের এই নতুন আবহে বাংলাদেশ যদি নিজের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত সুবিধাকে কাজে লাগাতে চায়, তবে একমুখী কূটনীতি পরিহার করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট অক্ষের দিকে ঝুঁকে না পড়ে জাতীয় নিরাপত্তাকেই সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা এখন সময়ের দাবি। 
সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও নতুন বাস্তবতার তাগিদ
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই একপেশে নীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানোর পরামর্শ উঠে এসেছে এই সেমিনার থেকে। জহরত আদিব চৌধুরী জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত তার সার্বভৌমত্বের সুরক্ষায় অবিচল থাকা। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে চুক্তি সম্পাদন করতে হবে, যেখানে দাতা বা প্রতিবেশী দেশের কোনো অন্যায্য শর্তের সামনে মাথা নত করা হবে না। 
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এখন থেকে আবেগ কিংবা অন্ধ তোষামোদি নয়, বরং তথ্য, পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণা এবং কঠোর অর্থনৈতিক কূটনীতিকে ঢাল বানিয়ে আন্তর্জাতিক দরবারে বাংলাদেশের ন্যায্য পাওনা ও অধিকার আদায় করতে হবে।

মাসুম

About Author

I am a sarvent of Allah. I follow mohammad (sm) only. "La ilaha Illallahu Muhammadur rasulullah"

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র