সমীকরণের নতুন খেলা: ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট কি সত্যিই পাশে দাঁড়ালেন আরব দলগুলোর?
ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট ইসহাক হারজগ নেসেটের আরব রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি যে নমনীয় মনোভাব দেখিয়েছেন, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। তেল আবিবের চরম ডানপন্থী সরকারের নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মাঝে রাষ্ট্রপ্রধানের এমন অবস্থানকে অনেকেই বেশ বিস্ময়ের চোখে দেখছেন। প্রথম দেখায় এটিকে আরব সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা মনে হলেও, বিশ্লেষকদের একাংশ একে গভীর রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই দেখছেন। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ চরম রাজনৈতিক মেরুকরণের এই সন্ধিক্ষণে প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপ তেল আবিবের ক্ষমতার অলিন্দে নতুন এক সমীকরণ তৈরি করেছে।
সংবাদের মূল বিষয়সমূহ:
• ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট ইসহাক হারজগ আরব দলগুলোর সাথে সংলাপ ও তাদের মূলধারার রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে মত দিয়েছেন।
• নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটের পক্ষ থেকে আরব রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘সন্ত্রাসবাদের সমার্থক’ হিসেবে চিত্রায়িত করার তীব্র বিরোধিতা করেছেন তিনি।
• বিশ্লেষকদের মতে, দেশের চরম অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ফাটল ঠেকাতেই রাষ্ট্রপ্রধান এই মধ্যপন্থী অবস্থান নিয়েছেন।
• আরব দলগুলোর নেতারা এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও বাস্তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন।
পর্দার আড়ালে চলমান গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণ
ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলো সবসময়ই এক প্রকার কোণঠাসা অবস্থায় দিন পার করে। বিশেষ করে বর্তমান চরম ডানপন্থী সরকারের মন্ত্রীরা যখন তখন আরব নাগরিকদের অধিকার এবং তাদের জনপ্রতিনিধিদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ঠিক এই রকম একটি বৈরী পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট সরাসরি নেসেটের আরব দলগুলোর নেতাদের সাথে বৈঠক করেন এবং তাদের দাবিদাওয়ার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ইসরায়েলি সমাজের সকল অংশের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রপ্রধানের মূল লক্ষ্য। তবে এই আলোচনার সুদূরপ্রসারী কোনো আইনি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের না থাকায় এটি কেবলই একটি প্রতীকী সান্ত্বনা কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
নেতানিয়াহু শিবিরের অস্বস্তি ও বর্ণবাদের অভিযোগ
প্রেসিডেন্টের এই নমনীয় অবস্থান কিন্তু বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টরপন্থী লিকুদ পার্টি এবং তাদের অতি-ডানপন্থী মিত্ররা খুব একটা ভালো চোখে দেখছে না। তারা মনে করে, আরব দলগুলোকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হলে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। অন্যদিকে, আরব দলগুলোর নেতারা বলছেন যে, কেবল মুখের কথায় তাদের অধিকার ফিরবে না, বরং বাজেটে সমবণ্টন ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্য দূর করতে হবে।
এই টানাপোড়েনের মাঝেই তেল আবিবের রাজপথে কট্টরপন্থীদের বিক্ষোভ এবং আরব নাগরিকদের ওপর পুলিশের অতিরিক্ত নজরদারি দিন দিন বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট হারজগ এই ক্রমবর্ধমান ফাটল রুখতে নিজেকে একজন নিরপেক্ষ অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন।
পশ্চিমা বিশ্বের চাপ নাকি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার চেষ্টা?
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ইসরায়েল এখন গাজা ও লেবানন সংকটের কারণে ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক পশ্চিমা দেশই ইসরায়েলের ভেতরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং আরব সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার রক্ষার ব্যাপারে বারবার তাগিদ দিচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইসরায়েলের একটি উদারপন্থী ও গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি তুলে ধরতেই ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট এই কৌশলগত অবস্থান বেছে নিয়েছেন।
তবে ভূ-রাজনীতির মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা bracing। কারণ ইসরায়েলি আরবদের একটি বড় অংশই মনে করে, নেসেটে তাদের প্রতিনিধিত্ব কেবলই নামেমাত্র এবং নীতিনির্ধারণে তাদের কোনো প্রকৃত অংশীদারিত্ব নেই।
আরব দলগুলোর প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা
আইমান ওদেহসহ প্রধান প্রধান আরব জোটের শীর্ষ নেতারা রাষ্ট্রপতির এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও তারা কিছু বাস্তব পদক্ষেপের দাবি তুলেছেন। তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, যদি আরব শহরগুলোতে অপরাধের মাত্রা কমানো না যায় এবং বাজেটে বরাদ্দ না বাড়ানো হয়, তবে এই বৈঠক অর্থহীন।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ এখন কোন দিকে মোড় নেবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের অবসানের ওপর। প্রেসিডেন্ট হারজগের এই আপাত নমনীয়তা কি সত্যিই আরব দলগুলোর অবস্থান সুদৃঢ় করবে, নাকি তা কেবলই একটি সাময়িক রাজনৈতিক প্রলেপ, তা সময়ই বলে দেবে।



