সেনাপ্রধানের বিদেশ সফর সফলভাবে সম্পন্ন করে ৯ দিনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন শেষে শনিবার (১৭ অক্টোবর) আজ দেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে যে, সেনাপ্রধানকে বহনকারী বিশেষ বিমানটি আজ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এই দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে বিশ্বের দুই প্রভাবশালী দেশ অস্ট্রেলিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও সামরিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাল বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
সেনাপ্রধানের সফরের মূল অর্জন ও হাইলাইটস:
-
- অস্ট্রেলিয়ার দ্বিপাক্ষিক মিশন: পার্থে আয়োজিত আন্তর্জাতিক ল্যান্ড ফোর্সেস এক্সপোজিশন ও সিম্পোজিয়ামে সেনাপ্রধানের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
- একাডেমিক সহযোগিতা: বাংলাদেশের ‘এমআইএসটি’ এবং মেলবোর্নের ‘ডিকিন ইউনিভার্সিটি’র মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণা চুক্তি সম্প্রসারণের আলোচনা।
- ওয়াশিংটন ডিসি সম্মেলন: অ্যাসোসিয়েশন অব দ্য ইউএস আর্মি (এইউএসএ) এর বার্ষিক হাই-লেভেল মিটিং ও সামরিক প্রদর্শনীতে অংশ গ্রহণ।
- পেশাগত সম্পর্ক জোরদার: ইউএস আর্মি প্যাসিফিক (ইউএসএআরপিএসি) এবং অস্ট্রেলীয় সেনাবাহিনীর সাথে যৌথ প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের দ্বার উন্মোচন।
সেনাপ্রধানের বিদেশ সফর এবং প্রথম ধাপের অস্ট্রেলিয়া মিশন
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার এই ৯ দিনের ম্যারাথন সফরের প্রথম ধাপে গত ৩ অক্টোবর ঢাকা ত্যাগ করে সরাসরি অস্ট্রেলিয়ার পার্থে পৌঁছান। সেখানে তিনি বৈশ্বিক সামরিক সম্প্রদায়ের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন ‘দ্য চিফ অব আর্মি সিম্পোজিয়াম অ্যান্ড ল্যান্ড ফোর্সেস ইন্টারন্যাশনাল ডিফেন্স এক্সপোজিশন ২০২৬’-এ যোগ দেন। এই সিম্পোজিয়ামে বিভিন্ন দেশের সেনাপ্রধানদের সামনে তিনি সমকালীন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবময় ভূমিকার কথা জোরালোভাবে তুলে ধরেন। এক্সপোজিশনে প্রদর্শিত আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি এবং যুদ্ধাস্ত্রের কার্যকারিতা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান।
পার্থের সরকারি কর্মসূচি শেষ করে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান মেলবোর্নে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত ডিকিন ইউনিভার্সিটি পরিদর্শন করেন। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়টির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সাথে তিনি এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন। এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)-এর সাথে শিক্ষা ও উচ্চতর সামরিক গবেষণার ক্ষেত্রগুলো আরও প্রশস্ত করা। দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অ্যাকাডেমিক বিনিময় কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান আদান-প্রদানের বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে আইএসপিআর সূত্রে জানা গেছে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন সামরিক নেতৃত্বের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
অস্ট্রেলিয়ার সফল মিশন শেষ করে সেনাপ্রধান সরাসরি পাড়ি জমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে। সেখানে মার্কিন স্থলবাহিনীর সবচেয়ে বড় বার্ষিক আয়োজন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব দ্য ইউএস আর্মি (এইউএসএ) অ্যানুয়াল মিটিং অ্যান্ড এক্সপোজিশন’-এ যোগ দেন তিনি। এই সম্মেলনে যোগ দিয়ে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাতের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ও সামরিক নীতিনির্ধারকদের সাথে বেশ কয়েকটি সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং রুদ্ধদ্বার বৈঠক পরিচালনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের স্থলবাহিনী কমান্ড অর্থাৎ ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি প্যাসিফিক (ইউএসএআরপিএসি)-এর শীর্ষ কমান্ডারদের সাথেও জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আধুনিক যুদ্ধকৌশল, কাউন্টার-টেররিজম অপারেশন এবং দুর্যোগকালীন উদ্ধার তৎপরতার ক্ষেত্রে দুই দেশের সেনাবাহিনীর যৌথ সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়। এই আলোচনা আগামী দিনে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান পেশাগত সম্পর্ককে আরও বেশি মজবুত করবে বলে আশা করছে ঢাকা।
সামরিক অবকাঠামো পরিদর্শন ও অভিজ্ঞতা বিনিময়
সফরকালে সেনাপ্রধান কেবল সেমিনারেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি কৌশলগত সামরিক স্থাপনা ও যুদ্ধাস্ত্র তৈরির কারখানা পরিদর্শন করেন। এই পরিদর্শনের মাধ্যমে উন্নত দেশগুলোর আধুনিক সামরিক ব্যবস্থাপনা এবং ব্যারাকে নিয়োজিত সৈন্যদের প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আধুনিকায়নের যে ‘ফোর্সেস গোল’ পরিকল্পনা চলছে, এই অভিজ্ঞতা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। আধুনিক প্রযুক্তির সাথে দেশীয় তরুণ অফিসারদের পরিচিত করতে মার্কিন ও অস্ট্রেলীয় সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কোর্স বাড়ানোর অনুরোধও জানান সেনাপ্রধান।
প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে নতুন মাইলফলক
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের এই সফল সফরের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তা মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহত হলো। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন দুই দেশের শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা। বিশ্বস্ত ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এই সফরের মাধ্যমে আরও এক ধাপ বৃদ্ধি পেল।
উভয় দেশের প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে এই ফলপ্রসূ মতবিনিময় বাংলাদেশের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বহিরাগত হুমকি মোকাবেলার কৌশলগত প্রস্তুতিতে দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা এনে দেবে। আজ ঢাকায় ফেরার পর সেনাপ্রধানকে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়