রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়োজিত একজন কাস্টমস কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় অবশেষে মেজর আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার হয়েছেন। শুক্রবার (২ অক্টোবর) দুপুরের দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) একটি বিশেষ দল রাজধানীর একটি আবাসিক এলাকা থেকে তাকে আইনগত হেফাজতে নেয়। সাবেক এই সংসদ সদস্যের এমন আকস্মিক গ্রেপ্তারের ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ নাগরিকদের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। বিমানবন্দর থানার পুলিশ সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের মামলার ভিত্তিতে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
মূল হাইলাইটস
-
- হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও শুল্ক কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে মামলা।
- মামলা দায়েরের পর ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষ অভিযানে সাবেক বিতর্কিত এমপি মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার।
- গ্রিন চ্যানেলে তল্লাশি নিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ।
- আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর স্থানে নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাউকে কোনো ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা প্রশাসনের।
গ্রিন চ্যানেলে ধুন্ধুমার কাণ্ড ও মামলার নেপথ্য কাহিনী
বিমানবন্দর থানা পুলিশ ও কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে বিদেশ থেকে একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। ইমিগ্রেশন শেষ করে তিনি যখন লাগেজ নিয়ে গ্রিন চ্যানেল পার হচ্ছিলেন, তখন সেখানে দায়িত্বরত শুল্ক গোয়েন্দা ও কাস্টমস কর্মকর্তারা তাঁর লাগেজ স্ক্যানিং করার অনুরোধ জানান। এতে তিনি চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সাথে অত্যন্ত অশালীন ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন। একপর্যায়ে কর্তব্যরত একজন কাস্টমস সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে তিনি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন এবং দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর বিমানবন্দরে কর্তব্যরত অন্যান্য কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়। পরবর্তীতে সরকারি কাজে বাধা দান, সরকারি কর্মচারীকে লাঞ্ছিত করা এবং রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর নিরাপত্তা জোনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট অপরাধ এনে বিমানবন্দর থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়। মামলার এজাহারে প্রত্যক্ষদর্শী কর্মকর্তা ও সিসিটিভি ফুটেজের বিবরণ সংযুক্ত করা হয়েছে।
আইন প্রয়োগে কঠোর বার্তা ও আসামিকে আদালতে প্রেরণের প্রস্তুতি
ঘটনার পর থেকেই জনমনে প্রশ্ন ছিল যে, একজন প্রভাবশালী সাবেক আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কোনো কড়া আইনি পদক্ষেপ নেবে কিনা। তবে ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সংবাদমাধ্যমকে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। সুনির্দিষ্ট তদন্তের স্বার্থেই মেজর আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার সংক্রান্ত অভিযানটি পরিচালনা করা হয়েছে। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পরই এই অভিযানে নামে।
দুপুরে গ্রেপ্তারের পর তাকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল শনিবার সকালে তাকে ঢাকার চিফ মেট্রেপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে সোপর্দ করা হবে। তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ঘটনার নেপথ্যের বিস্তারিত উদঘাটনের স্বার্থে আদালতে আসামির রিমান্ড আবেদন করতে পারেন বলে জানা গেছে। এদিকে কাস্টমস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন এই সময়োচিত পদক্ষেপের জন্য পুলিশ প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়েছে এবং দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে।
ভিআইপি সংস্কৃতির অবসান ও সচেতন মহলের প্রতিক্রিয়া
আমাদের দেশের বিমানবন্দরগুলোতে প্রায়শই কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির আইন অমান্য করার এবং কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব খাটানোর নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই সংস্কৃতির কারণে সাধারণ প্রবাসীরা যেমন হয়রানির শিকার হন, তেমনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। এই ঘটনার পর সচেতন নাগরিক সমাজ ও অপরাধ বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এটি প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি ইতিবাচক বার্তা। আইন সবার জন্য সমান—এই নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বিমানবন্দরে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের এই আইনি গ্যাঁড়াকলে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, এটি সম্পূর্ণ একটি পেশাগত ও ফৌজদারি অপরাধের বিষয়, এর সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। বিমানবন্দরে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষায় এই মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার দাবি উঠছে সর্বস্তরের জনমানুষের পক্ষ থেকে।