মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক বৈঠক স্থগিত, তেলের বাজারে ঊর্ধ্বগতি
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা। হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথে হামলা ও সংঘাতের পাশাপাশি ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে নির্ধারিত কূটনৈতিক বৈঠক স্থগিত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
সৌদি আরবে হুথিদের নতুন হামলা, দেশটির ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং উপসাগরে জাহাজে হামলার ঘটনায় সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা বাড়িয়েছে তেলের এই ঊর্ধ্বগত।
কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও আপাতত মিলিয়ে যাচ্ছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যিদ বদর আলবুসাইদি রোববার রাতে জানান, ‘ঐকমত্যের স্বার্থে’ সোমবারের আঞ্চলিক বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। বৈঠকটিতে ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
এর আগে ইরানি কর্মকর্তারা বলেছিলেন, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে ওই বৈঠকে তারা অংশ নেবেন এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ওমানের সঙ্গে ইরানের একটি সমঝোতা তুলে ধরবেন। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন হতো।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, কয়েকটি আঞ্চলিক দেশের অনুরোধে তেহরান ও মাসকাটের যৌথ সিদ্ধান্তে বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। নতুন তারিখ নির্ধারণে ইরান ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করবে।
বৈঠক স্থগিত হওয়ার ঘটনাটি আসে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের পরপরই। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনের প্রধান বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত এই পাইপলাইনটি শুক্রবার হামলার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, রোববার প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় একটি জাহাজে নিক্ষিপ্ত বস্তু আঘাত হানে। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং নাবিকদের সরিয়ে নিতে হয়। ইরান জানিয়েছে, দেশটির উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় একজন নিহত ও চারজন ক্রু আহত হয়েছেন।
সোমবার প্রকাশিত প্রাথমিক জাহাজ চলাচল তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজের চলাচল দিনে এক অঙ্কের সংখ্যায় নেমে এসেছে। গত ১০ দিনের গড় ছিল দিনে ১৪টি জাহাজ। তবে শনাক্তকরণ এড়াতে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রেখে যেসব জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, সেগুলো এই হিসাবের বাইরে রয়েছে।
সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে গত সপ্তাহে জুলাইয়ের পর প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ডিজেলের খুচরা দামও রোববার নতুন রেকর্ড গড়ে গ্যালনপ্রতি ৬.২০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
রয়টার্সকে সৌদি তেলের ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, শুক্রবার হামলার শিকার পাইপলাইনটি বন্ধ থাকলে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে মজুত তেল দিয়ে সৌদি আরব মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিন রপ্তানি চালিয়ে যেতে পারবে। এরপর বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়ে ইতোমধ্যে যে বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে, তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধ শেষের সময়সীমা জানালেন ট্রাম্প
সৌদি আরব এখনো পাইপলাইনের ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত জানায়নি এবং এটি কতদিন বন্ধ থাকবে তাও স্পষ্ট করেনি। বিভিন্ন সূত্র মেরামতে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে। স্যাটেলাইট ছবিতেও পাইপলাইনের কয়েকটি স্থান থেকে বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে।
এদিকে ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর সাম্প্রতিক সহিংসতা নতুন করে বেড়েছে। এর আগে আগস্টে তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ কিছুটা বাড়ছিল।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি লন্ডনভিত্তিক প্যান-আরব সংবাদমাধ্যম আল-আরাবি আল-জাদিদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ওমানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলেও যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের দাবি পূরণ না করা পর্যন্ত ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে না।
আরও পড়ুন: বাব আল-মান্দেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুথিরা
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র লক্ষ্যও এখনো পূরণ হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলার সক্ষমতা ঠেকানো এবং দেশটির জনগণের জন্য শাসকদের উৎখাতের পরিস্থিতি তৈরি করা।
আয়ারল্যান্ড সফরে গিয়ে ট্রাম্প আবারও বলেছেন, চলতি বছরের মধ্যেই ইরান যুদ্ধের অবসান হবে বলে তিনি আশা করছেন। এমনকি নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ শেষ হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। যুদ্ধ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম ‘পাথরের মতো দ্রুত’ কমে যাবে বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প।





