ওয়াশিংটনকে বিশ্বাস করা যায় না: হুঁশিয়ারি ইরানের প্রধান আলোচকের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাঠানো নতুন ও কঠোর শর্তযুক্ত শান্তি প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরানের প্রধান আলোচক তথা দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সাফ জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনকে কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যায় না।
ইরানি জনগণের সব অধিকার সম্পূর্ণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তেহরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শর্তে বা চুক্তিতে পা দেবে না। গতকাল রোববার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি এই অনমনীয় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন, যা দুই দেশের চলমান সংকটকে এক নতুন ও জটিল সমীকরণে দাঁড় করিয়েছে।
তেহরানের কড়া জবাব ও ট্রাম্পের ‘আর্ট অব দ্য ডিল’
সম্প্রতি মার্কিন গণমাধ্যমে খবর আসে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ অবসানের উদ্দেশ্যে তৈরি পূর্ববর্তী খসড়া চুক্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন। হরমুজ প্রণালী ও পরমাণু কর্মসূচির ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে একটি নতুন প্রস্তাব তেহরানের কাছে পাঠায় হোয়াইট হাউস। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার শর্তে রাজি হয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই একতরফা দাবিকে ‘মিথ্যা ও সত্যের মিশ্রণ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে ইরান।
প্রধান আলোচক গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় লিখেছেন, “আমরা আলোচনার টেবিলে নয়, বরং ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তিতে নিজেদের অধিকার আদায় করি। সংলাপে আমরা কেবল প্রতিপক্ষকে বাস্তব পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে দিই মাত্র।” তিনি স্পষ্ট করেন যে, মৌখিক আশ্বাস বা কাগজের দলিলের কোনো মূল্য ইরানের কাছে নেই। ওয়াশিংটনকে আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দকৃত ১২ বিলিয়ন ডলার তহবিল ফিরিয়ে দেওয়ার মতো বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে সততার প্রমাণ দিতে হবে।
পর্দার আড়ালে গভীর মতপার্থক্য
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসতে চাইছে, কিন্তু একই সঙ্গে ঘরোয়া রাজনীতি এবং মিত্রদেশ ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ বজায় রাখতে চাইছে। অপরদিকে, ইরান একে দেখছে মার্কিন আধিপত্যবাদের আরেকটি চাল হিসেবে। এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের কারণে দীর্ঘদিনের মধ্যস্থতা ও যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা এখন পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
সংকটের মূল কারণ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ
-
অনাস্থার প্রাচীর: ইরানের সাফ কথা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিশ্রুতির ওপর তাদের আস্থা নেই; চুক্তিতে সই করার একমাত্র শর্ত হলো ইরানের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অধিকারের পূর্ণ স্বীকৃতি।
-
ট্রাম্পের নতুন খসড়া: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীতে টোলমুক্ত জাহাজ চলাচল এবং ইরানের ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার মতো অত্যন্ত কঠোর কিছু শর্ত যুক্ত করেছেন।
-
জব্দকৃত অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবি: তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আটকে থাকা ১২ বিলিয়ন ডলারের ইরানি তহবিল অবমুক্ত না করা পর্যন্ত মূল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত আলোচনা সম্ভব নয়।
-
আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা: ৬০ দিনের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যদি দুই পক্ষ কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ধসে পড়তে পারে।
কোন দিকে যাচ্ছে ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্ক?
মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের এই কঠোর মন্তব্য প্রমাণ করে যে, ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি’র সামনে ইরান মাথা নোয়াতে প্রস্তুত নয়। বরং গালিবাফের হুঁশিয়ারি—”যেকোনো চুক্তির পরদিনের যুদ্ধের জন্য যে পক্ষ বেশি প্রস্তুত থাকবে, জয় আসলে তারই হবে।”
কূটনৈতিক আলোচনার আড়ালে দুই দেশের এই অনড় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ওয়াশিংটন যদি তাদের আরোপিত কঠোর শর্ত শিথিল না করে এবং তেহরান যদি তাদের অধিকার আদায়ে অনমনীয় থাকে, তবে এই শান্তি প্রস্তাব কেবল কাগজের খসড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ফলে আগামী দিনগুলোতে পারস্য উপসাগরে বারুদের গন্ধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কাই প্রবল হচ্ছে।





