জাতীয় ফিচার

যানজটমুক্ত ঢাকা গড়ার মহাপরিকল্পনা: প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

যানজটমুক্ত ঢাকা গড়ার মহাপরিকল্পনা: প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

রাজধানী ঢাকার চিরচেনা যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনতে নড়েচড়ে বসেছে সরকার। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সভায় যানজটকে ঢাকার অর্থনীতির প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত প্রতিকারের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এই সভায় ঢাকার পরিবহন খাতের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা অংশ নেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই বৈঠকে যানজটের কারণগুলো ব্যবচ্ছেদ করে দেখা হয় এবং স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে দেন যে, সাধারণ মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া আর কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।

সভায় উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম রবি, রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। এছাড়াও বিশেষ আমন্ত্রণে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট শিমুল বিশ্বাস এমপি।

সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় জোর:

বৈঠকের মূল আলোচনা ছিল ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজড করা এবং বিভিন্ন পরিবহন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করতে হলে আমাদের কেবল ফ্লাইওভার কেন্দ্রিক চিন্তা করলে হবে না। সড়ক, রেল ও নৌপথের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।”

সড়ক পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম রবি সভায় জানান, বিদ্যমান ট্রাফিক সিগন্যালগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নিয়ন্ত্রিত স্মার্ট সিগন্যালিং সিস্টেমে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা হবে। অন্যদিকে, দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদের ওপর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করে সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ সুগম করার। বিশেষ করে ঢাকার চারপাশের সার্কুলার রেলপথ ও নৌপথকে মূল পরিবহনের সাথে একীভূত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন রেল প্রতিমন্ত্রী ও নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা।


সভার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও বিশেষ দিকসমূহ:

বৈঠক শেষে জনপ্রশাসন বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নিম্নোক্ত পরিবর্তনগুলো আসতে যাচ্ছে:

  • স্মার্ট ট্রাফিক কন্ট্রোল: এনালগ সিগন্যালের পরিবর্তে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রবর্তন।

  • অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান: দুই সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবৈধ পার্কিং ও ফুটপাত দখলদারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত বিশেষ অভিযান।

  • নৌ ও রেলপথের সমন্বয়: ঢাকার চারপাশের নদীপথকে সচল করে যাত্রী পরিবহনের মূল স্রোতে নিয়ে আসা এবং বৃত্তাকার রেলপথের উন্নয়ন।

  • আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ব্যবহার: ড্রোনের মাধ্যমে যানজট পর্যবেক্ষণ এবং রিয়েল-টাইম ডেটা ব্যবহার করে ট্রাফিক ডাইভারশন।

  • যৌথ টাস্কফোর্স: পুলিশ, সিটি করপোরেশন এবং পরিবহন মালিকদের নিয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মনিটরিং সেল গঠন।


বৈঠকে অংশ নেওয়া অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই উদ্যোগ ঢাকার পরিবহন খাতে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটাতে সহায়ক হবে। তবে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করা এবং দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা।

সদ্য নিযুক্ত দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদ্বয় সভায় আশ্বস্ত করেছেন যে, আসন্ন কয়েক মাসের মধ্যেই ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে যানজটের দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যাবে। বিশেষ করে স্কুল ও অফিস আওয়ারে যানজট কমিয়ে আনতে ব্যক্তিগত গাড়ির নিয়ন্ত্রণ এবং গণপরিবহনের মানোন্নয়নে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

ঢাকার যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর এই ব্যক্তিগত আগ্রহ ও সরাসরি নির্দেশনা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা। এখন দেখার বিষয়, সচিবালয়ের এই উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন মাঠপর্যায়ে কত দ্রুত এবং কতটুকু স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন হয়।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র