ফিচার স্বাস্থ্য

জিবে অসহ্য জ্বালাপোড়া ও চেরা দাগ? অবহেলা করলেই বিপদ

জিবে অসহ্য জ্বালাপোড়া ও চেরা দাগ? অবহেলা করলেই বিপদ

জিবে চেরার মতো দাগ, সামান্য ঝাল-টক খাবার খেলেই আগুনের মতো জ্বালাপোড়া কিংবা তীব্র অস্বস্তি—আমাদের চারপাশে অনেকেরই এটি চেনা সমস্যা। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে এটি শরীরের কোনো গভীর অসুখ, পুষ্টির চরম ঘাটতি কিংবা হরমোনের পরিবর্তনের আগাম সতর্কবার্তা হতে পারে।

কেন এই ভোগান্তি? অন্তরালের কারণ

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় জিবের এই জ্বালাপোড়া ভাবকে অনেক সময় ‘বার্নিং মাউথ সিনড্রোম’ বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে জিবে ম্যাপের মতো দাগ দেখা যায়, যাকে বলা হয় ‘জিওগ্রাফিক টাং’। দীর্ঘ ১৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি, মানুষ জিবের সমস্যাকে সবচেয়ে বেশি অবহেলা করে। অথচ এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে একাধিক কারণ।

১. পুষ্টির মারাত্মক অভাব:

জিবে জ্বালাপোড়া হওয়ার প্রধানতম কারণ হলো ভিটামিন বি-১২, ফলিক অ্যাসিড এবং আয়রনের অভাব। শরীরে রক্তস্বল্পতা দেখা দিলে জিবের উপরিভাগ মসৃণ হয়ে যায় এবং সংবেদনশীলতা বেড়ে যায়। ফলে সামান্য মশলাদার খাবারও অসহ্য ঠেকে।

২. ছত্রাক সংক্রমণ (ওরাল থ্রাশ):

মুখের ভেতর ক্যানডিডা নামক ছত্রাকের সংক্রমণ হলে জিবের ওপর সাদা স্তর পড়ে এবং জ্বালাপোড়া শুরু হয়। বিশেষ করে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম বা যারা দীর্ঘকাল অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করছেন, তাদের এই ঝুঁকি বেশি।

৩. হরমোনের পরিবর্তন ও মানসিক চাপ:

নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজের সময় বা তার পরে হরমোনের ভারসাম্যের অভাবে মুখে ও জিবে জ্বালাপোড়া হতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা ক্রনিক স্ট্রেস জিবের স্নায়ুগুলোকে অতি-সংবেদনশীল করে তোলে।

৪. দাঁতের সমস্যা ও রাসায়নিক বিক্রিয়া:

অনেক সময় দাঁতের ধারালো অংশ বা ত্রুটিপূর্ণ ডেন্টাল ফিলিং জিবের পাশে ঘষা লেগে ঘায়ের সৃষ্টি করে। এছাড়া অতিরিক্ত কড়া টুথপেস্ট বা মাউথওয়াশের রাসায়নিক উপাদানের কারণেও জিবের ওপরের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

দ্রুত উপশমের উপায় ও চিকিৎসা

জিবে জ্বালাপোড়া শুরু হলে শুরুতেই আতঙ্কিত না হয়ে কিছু সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তবে সমস্যা দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের (ওরাল মেডিসিন বা ডার্মাটোলজিস্ট) পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক।

  • খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন: অতিরিক্ত গরম, ঝাল এবং অম্লীয় বা টক জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। এগুলো জিবের ক্ষতকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

  • পর্যাপ্ত জলপান: মুখ শুকিয়ে গেলে জ্বালাপোড়া বাড়ে। তাই সারাদিন অল্প অল্প করে জল পান করে মুখ সবসময় ভেজা রাখা প্রয়োজন।

  • ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন: তামাক বা অ্যালকোহল জিবের টিস্যুকে সরাসরি পুড়িয়ে দেয় এবং ঘা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

  • ঘরোয়া টোটকা: সাময়িক আরাম পেতে মুখে এক টুকরো বরফ রাখা যেতে পারে। তবে জিব কামড়ে ফেলা বা ঘষা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

এক নজরে মূল সতর্কতা ও তথ্যাবলি:

  • লক্ষণ: জিব লাল হয়ে যাওয়া, মাঝখানে বা পাশে চেরা দাগ, তামাটে স্বাদ পাওয়া।

  • তদন্ত: প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা (CBC, Vitamin B12 level) করে নিশ্চিত হওয়া জরুরি কেন এমন হচ্ছে।

  • ডায়াবেটিস সংযোগ: রক্তে শর্করার মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত থাকলে মুখে জ্বালাপোড়া ও সংক্রমণের হার বহুগুণ বেড়ে যায়।

  • গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা: পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড বা রিফ্লাক্সের কারণেও জিবের আগায় অস্বস্তি হতে পারে।

চিকিৎসাশাস্ত্রে জিবকে অনেক সময় ‘শরীরের আয়না’ বলা হয়। কারণ ভেতরের অনেক রোগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই অঙ্গটির মাধ্যমে। জিবের চেরা দাগ বা জ্বালাপোড়াকে কেবল ‘পেটের গরম’ ভেবে এড়িয়ে যাওয়া বোকামি।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার