পরিত্যক্ত বাড়িতে ‘ভূতের ভয়’ না কি বিজ্ঞানের কারসাজি?
পুরোনো বা পরিত্যক্ত ভবনে প্রবেশ করলে আচমকা গা ছমছমে ভাব কিংবা অকারণ ভয়ের নেপথ্যে কোনো ‘ভূতের ভয়’ বা অতিপ্রাকৃত শক্তি নয়, বরং দায়ী ‘ইনফ্রাসাউন্ড’ বা অতি-নিম্ন কম্পাঙ্কের শব্দ। সম্প্রতি আচরণগত স্নায়ুবিজ্ঞান (Behavioral Neuroscience) বিষয়ক একটি সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষের কানে ধরা না দেওয়া ২০ হার্টজের নিচের এই শব্দতরঙ্গই মস্তিষ্কে ভীতি সঞ্চার করে।
রহস্যের আড়ালে বিজ্ঞানের হাতছানি
বহুদিন ধরে জনমানুষের মনে ধারণা ছিল যে, জনমানবহীন ভাঙাচোরা অট্টালিকা বা পুরোনো দালানকোঠায় অশরীরী কোনো অস্তিত্বের বাস থাকে। সেখানে গেলে বুক ধড়ফড় করা, ঘাম হওয়া কিংবা চোখের কোণে অস্পষ্ট কিছু দেখার যে অভিজ্ঞতা মানুষের হয়, সেটিকে এবার বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে বিচার করেছেন গবেষকরা। তাঁদের মতে, মানুষের শ্রবণক্ষমতার বাইরে থাকা এই ইনফ্রাসাউন্ড বা নিম্ন কম্পাঙ্কের শব্দ সরাসরি স্নায়ুর ওপর চাপ তৈরি করে, যা মানুষকে বিভ্রমের দিকে ঠেলে দেয়।
গবেষণাটি বলছে, ২০ হার্টজের নিচের শব্দ আমরা শুনতে পাই না ঠিকই, কিন্তু আমাদের শরীর ঠিকই সেই কম্পন অনুভব করে। এই কম্পন যখন নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছায়, তখন মানুষের মধ্যে অহেতুক আতঙ্ক, বিষণ্ণতা কিংবা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব তৈরি হতে পারে। এমনকি চোখের মণি বা আইবল-এ এই কম্পন আঘাত করলে মানুষ হ্যালুসিনেশন বা দৃষ্টিবিভ্রমের শিকার হতে পারে, যা অনেক সময় ‘ভূত’ দেখার মতো অনুভূতির জন্ম দেয়।
ইনফ্রাসাউন্ডের উৎস আসলে কী?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, পরিত্যক্ত বাড়িতে এই শব্দ আসে কোথা থেকে? গবেষকরা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, পুরোনো ভবনের মরিচা ধরা পাইপলাইন দিয়ে বাতাস চলাচলের সময় এক ধরণের শোঁ শোঁ শব্দ বা নিম্ন কম্পন তৈরি হয়। এছাড়া দীর্ঘদিনের পুরনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা শিল্পকারখানার ভারী যন্ত্রপাতির অবশিষ্টাংশ থেকেও এই তরঙ্গের সৃষ্টি হতে পারে।
প্রাকৃতিকভাবেও ইনফ্রাসাউন্ড তৈরি হতে পারে। শক্তিশালী ঝোড়ো হাওয়া যখন কোনো ভাঙা জানালার ফোকর দিয়ে প্রবেশ করে কিংবা ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ফলে ভূমিতে যে সূক্ষ্ম কম্পন তৈরি হয়, তা কয়েকশ কিলোমিটার দূরেও মানুষের স্নায়বিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
গবেষণার মূল বিষয়বস্তু একনজরে:
বিজ্ঞানীরা এই রহস্য উদঘাটনে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য উপাত্ত সাজিয়েছেন:
-
শ্রবণাতীত তরঙ্গ: মানুষ সাধারণত ২০ থেকে ২০,০০০ হার্টজ পর্যন্ত শব্দ শুনতে পায়। ২০ হার্টজের নিচের ইনফ্রাসাউন্ড মানুষের কানে না পৌঁছালেও শরীরের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
-
দৃষ্টিবিভ্রম: গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮.৯ হার্টজের কম্পাঙ্ক মানুষের চোখের মণির সাথে অনুরণন (Resonance) তৈরি করতে পারে, যার ফলে মানুষ স্থির বস্তুকে নড়াচড়া করতে দেখে বা ছায়া দেখতে পায়।
-
শারীরিক লক্ষণ: এই শব্দের প্রভাবে অকারণ ভয়, গা শিউরে ওঠা, শ্বাসকষ্ট এবং অস্বস্তি তৈরি হওয়া বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত।
-
দেয়াল ভেদের ক্ষমতা: সাধারণ শব্দের চেয়ে ইনফ্রাসাউন্ড অনেক বেশি শক্তিশালী এবং এটি অনায়াসেই মোটা দেয়াল বা পাথরের বাধা অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অতিপ্রাকৃত না কি মনস্তাত্ত্বিক?
প্রবীণ এই সাংবাদিকের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অতীতে বহু রহস্যময় ঘটনা শেষ পর্যন্ত যুক্তির আলোয় পরিষ্কার হয়েছে। এই গবেষণাও ঠিক সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। অনেক সময় পরিত্যক্ত ভবনের স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে জন্ম নেওয়া এক ধরনের ছত্রাক বা ‘মোল্ড’ থেকেও মানুষের শ্বাসকষ্ট বা মানসিক বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
তার সাথে ইনফ্রাসাউন্ড যুক্ত হলে ভয়ংকর এক অভিজ্ঞতার সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞান বলছে, আমাদের মস্তিষ্ক যখন কোনো অস্বস্তির কারণ খুঁজে পায় না, তখন সেটিকে ‘অলৌকিক’ হিসেবে চিহ্নিত করে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে।
ভয় আমাদের আদিম প্রবৃত্তি, আর অজানা বিষয়ের প্রতি মানুষের কৌতূহল চিরন্তন। তবে বিজ্ঞানের এই নতুন তথ্য আমাদের চারপাশের অনেক তথাকথিত ‘ভুতুড়ে’ স্থান সম্পর্কে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে শেখাবে।





