হেড-নেক ক্যানসার জয়ে ইমিউনোথেরাপিতে নতুন প্রাণের স্পন্দন
ক্যানসার চিকিৎসার চিরাচরিত প্রেক্ষাপট বদলে দিচ্ছে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিস্ময় ‘ইমিউনোথেরাপি’। বিশেষ করে মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার বা হেড-নেক ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের জন্য এটি হয়ে উঠেছে নতুন এক সঞ্জীবনী শক্তি।
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করার এই পদ্ধতি চিকিৎসকদের কাছে এখন এক আস্থার নাম।
ক্যানসার যুদ্ধে নতুন ধারার সূচনা
চিকিৎসা সাংবাদিকতায় গত দেড় দশকের পথচলায় আমরা দেখেছি, ক্যানসার মানেই ছিল রোগী ও স্বজনদের জন্য এক অবর্ণনীয় যাতনা। সার্জারি, কেমোথেরাপি আর রেডিওথেরাপির সেই চেনা চক্রে রোগীর শরীর প্রায়শই ভেঙে পড়ত। কিন্তু ইমিউনোথেরাপি এখানে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এটি সরাসরি ক্যানসার কোষকে আক্রমণ না করে বরং রোগীর নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘ইমিউন সিস্টেম’-কে প্রশিক্ষণ দেয়, যাতে শরীর নিজেই ক্যানসার শনাক্ত করে তা নির্মূল করতে পারে।
মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, টিউমারগুলো শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে বিশেষ এক ধরণের প্রোটিন আবরণ তৈরি করে। ইমিউনোথেরাপির ওষুধগুলো সেই ছদ্মবেশ উন্মোচন করে দেয়। ফলে আমাদের শ্বেতকণিকাগুলো ক্যানসার কোষকে শত্রু হিসেবে চিনতে পারে এবং নিপুণভাবে ধ্বংস করতে শুরু করে। এটি যেন অনেকটা যুদ্ধের ময়দানে অন্ধ সৈন্যের চোখে হঠাৎ দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার মতো।
কেন হেড-নেক ক্যানসারে এটি বেশি কার্যকর?
বাংলাদেশে হেড-নেক ক্যানসারের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। তামাক পাতা, জর্দা, ধূমপান এবং হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের (HPV) প্রভাবে প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষ এই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেক সময় শেষ পর্যায়ে ধরা পড়ার কারণে সার্জারি সম্ভব হয় না। এমন জটিল রোগীদের ক্ষেত্রে ইমিউনোথেরাপি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যাদের শরীরে প্রচলিত কেমোথেরাপি আর কাজ করছে না, তাদের জন্য ইমিউনোথেরাপি হতে পারে শেষ আশার আলো। এটি কেবল টিউমারের আকারই কমায় না, বরং রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করে এবং আয়ু বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
ইমিউনোথেরাপি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই আধুনিক জয়যাত্রা নিয়ে সাধারণ মানুষের জানবার আগ্রহ প্রবল। নিচে এর মূল দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
-
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম: কেমোথেরাপির মতো চুল পড়ে যাওয়া বা মারাত্মক বমি বমি ভাব এখানে অনেক কম থাকে। এটি শরীরের সুস্থ কোষগুলোকে আঘাত না করে শুধু আক্রান্ত কোষের ওপর কাজ করে।
-
সাফল্যের হার: চতুর্থ পর্যায়ের ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রেও ইমিউনোথেরাপি অভাবনীয় সাফল্য দেখাচ্ছে, যা আগে প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা হতো।
-
সতর্কতা: এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা এবং সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। বিশেষ কিছু বায়োমার্কার পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসক নির্ধারণ করেন কোন রোগী এই থেরাপি পাবেন।
আগামীর সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
ইমিউনোথেরাপি নিঃসন্দেহে ক্যানসার চিকিৎসার ইতিহাসে এক মাইলফলক। তবে বাংলাদেশে এর উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। একজন সচেতন সাংবাদিক হিসেবে আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো, সরকারি উদ্যোগে যদি এই আধুনিক ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা যায়, তবে দেশে ক্যানসারজনিত মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমানে দেশের বড় কিছু ক্যানসার হাসপাতালে সীমিত পরিসরে এই সেবা শুরু হয়েছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।





