সয়াবিন থেকে বাটারে মিলল উচ্চমাত্রার ট্রান্সফ্যাট
দেশের বাজারে প্রচলিত সয়াবিন বা ভোজ্যতেল ও দুগ্ধজাত পণ্যে উদ্বেগজনক মাত্রায় হৃদরোগের ঝুঁকি সৃষ্টিকারী ‘ট্রান্সফ্যাটি অ্যাসিড’ পাওয়া গেছে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) রাজধানীর এক সেমিনারে জানানো হয়, বাংলাদেশে হৃদরোগে মোট মৃত্যুর প্রায় চার শতাংশের জন্য দায়ী এই ক্ষতিকর উপাদান। যা এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সোমবার বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ও মুয়েন্জার বাংলা প্রাইভেট লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে ‘মানব স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর ব্যবহৃত রান্নার তেলের ক্ষতিকর প্রভাব’ শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। বিএফএসএ’র প্রশিক্ষণ কক্ষে আয়োজিত এই সেমিনারে মূল প্রবন্ধে উঠে আসে খাদ্য নিরাপত্তার এক ভয়াবহ চিত্র। সয়াবিন তেল, ডালডা, বাটার ও মার্জারিনের মতো নিত্যপণ্যে যে হারে ট্রান্সফ্যাট পাওয়া যাচ্ছে, তা হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নীরব ঘাতক যখন রসনা তৃপ্তিতে
ট্রান্সফ্যাট মূলত একটি কৃত্রিম চর্বি, যা তরল তেলকে জমে শক্ত হতে সাহায্য করে এবং খাবারের স্থায়িত্ব ও স্বাদ বাড়ায়। তবে এই ‘স্বাদ’ এখন জীবন কেড়ে নিচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে সতর্ক করে আসলেও, বর্তমান গবেষণা বলছে—আমাদের রান্নাঘরের অতি পরিচিত সয়াবিন তেল এবং বেকারিপণ্যে ব্যবহৃত ডালডাতে ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন মানুষের প্রতিদিনের মোট ক্যালরির মাত্র ১ শতাংশের কম আসা উচিত ট্রান্সফ্যাট থেকে। কিন্তু দেশের বাজারে প্রাপ্ত মার্জারিন এবং বাটারের নমুনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই হার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপৎসীমা ছাড়িয়ে গেছে।
সেমিনারের মূল পর্যবেক্ষণ ও ভয়াবহতা
সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ট্রান্সফ্যাট শরীরে ‘খারাপ কোলেস্টেরল’ (LDL) বাড়িয়ে দেয় এবং ‘ভালো কোলেস্টেরল’ (HDL) কমিয়ে ফেলে। ফলে রক্তনালীতে চর্বি জমে ব্লকেজ তৈরি হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে যত মানুষের মৃত্যু ঘটে, তার উল্লেখযোগ্য একটি অংশের কারণ হলো এই অনিরাপদ খাদ্যাভ্যাস। বিশেষ করে ডালডা দিয়ে তৈরি সিঙ্গাড়া, সমুচা ও বিস্কুটের মতো খাবারগুলো এখন সাধারণ মানুষের জন্য ‘স্লো পয়জন’ বা নীরব বিষে পরিণত হয়েছে।
বিপদের নেপথ্যে যেসব তথ্য উঠে এসেছে:
-
হৃদরোগে মৃত্যু: দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যুর প্রায় ৪ শতাংশের মূল কারণ খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটের উপস্থিতি।
-
বিপজ্জনক খাদ্যপণ্য: গবেষণায় সয়াবিন তেল, ডালডা, বাটার ও মার্জারিনকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
-
আইনি সীমারেখা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী শিল্পজাত ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা মোট চর্বির ২ শতাংশের নিচে থাকা বাধ্যতামূলক, যা অনেক কোম্পানিই মানছে না।
-
ব্যবহৃত তেলের পুনর্ব্যবহার: একবার ব্যবহার করা তেল বারবার গরম করলে তাতে ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা জ্যামিতিক হারে বাড়ে, যা হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
সেমিনারে উপস্থিত বক্তারা বলেন, শুধু আইন করে বা জরিমানা করে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। উৎপাদনকারীদের নৈতিকতা এবং সাধারণ ক্রেতাদের সচেতনতা এখানে মূখ্য। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, তারা বাজারে তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি কোম্পানিগুলোকে ট্রান্সফ্যাট কমিয়ে আনার নির্দেশনা দিচ্ছেন।





