অন্যান্য ফিচার বিশ্ব সংযোগ

আতঙ্কপুরী সিকিম: সাড়ে চার ঘণ্টায় ১৩ বার ভূমিকম্পে কাঁপল হিমালয়কন্যা

আতঙ্কপুরী সিকিম: সাড়ে চার ঘণ্টায় ১৩ বার ভূমিকম্পে কাঁপল হিমালয়কন্যা

শুক্রবার মাঝরাত থেকে ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত এক নিচ্ছিদ্র আতঙ্কের রাত পার করল ভারতের সিকিম। মাত্র সাড়ে চার ঘণ্টার ব্যবধানে অন্তত ১৩ বার ছোট-বড় ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে হিমালয়কন্যা খ্যাত এই রাজ্যটি। দফায় দফায় কম্পনে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ভীতির সৃষ্টি হয়েছে।

আতঙ্কের সেই সাড়ে চার ঘণ্টা

শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) যখন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই প্রথম কম্পনটি অনুভূত হয়। ঘড়ির কাঁটায় তখন মধ্যরাত। এরপর থেকে ভোর পর্যন্ত চলে প্রকৃতির এই তাণ্ডব। একের পর এক আফটার শকে কেঁপে ওঠে গ্যাংটক, নামচি, পেয়ং এবং মঙ্গনসহ রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা। অনেক বাসিন্দা ঘরবাড়ি ছেড়ে কনকনে ঠান্ডার মধ্যেই খোলা রাস্তায় বেরিয়ে আসেন।

ভূমিকম্পের তীব্রতা খুব বেশি না হলেও, এত অল্প সময়ের মধ্যে ঘনঘন কম্পন বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, কম্পনগুলোর কেন্দ্রস্থল ছিল উত্তর ও পূর্ব সিকিমের পার্বত্য অঞ্চল। তবে স্বস্তির খবর এই যে, এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

ভূ-তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট ও জনজীবন

সিকিম ভৌগোলিকভাবেই অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অঞ্চলে (সিসমিক জোন-৫) অবস্থিত। ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, হিমালয়ের নিচে থাকা টেকটোনিক প্লেটগুলোর নড়াচড়ার কারণেই এই ঘনঘন কম্পন। তবে এক রাতেই ১৩ বার কেঁপে ওঠা কিছুটা অস্বাভাবিক।

শহরের উঁচু দালান থেকে শুরু করে পাহাড়ি ঢালের গ্রামগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গ্যাংটকের এক হোটেল ব্যবসায়ী জানান, “প্রথমবার যখন দুলল, ভেবেছিলাম স্বাভাবিক। কিন্তু যখন আধা ঘণ্টা পর পর বিছানা নড়তে শুরু করল, তখন আর ঘরে থাকা নিরাপদ মনে হয়নি। পর্যটকরাও বেশ আতঙ্কিত।”

প্রশাসনের সতর্কতা ও আগামীর প্রস্তুতি

ঘটনার পরপরই সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী দপ্তর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জেলা শাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখতে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে। সিকিম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (SSDMA) সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে পুরনো বা জরাজীর্ণ ভবনগুলো থেকে দূরে থাকার এবং খোলা জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

শিলিগুড়ি ও পার্শ্ববর্তী উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতেও হালকা কম্পন অনুভূত হওয়ায় পর্যটন ব্যবসায় সাময়িক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সিকিমে বর্তমানে প্রচুর পর্যটক অবস্থান করছেন, তাদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে পর্যটন বিভাগ বিশেষ গাইডলাইন জারির কথা ভাবছে।

প্রকৃতির এই আকস্মিক আচরণ সিকিমের পাহাড়ে এক অশুভ সংকেত কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিশ্লেষণ চলছে। যদিও কোনো বড় অঘটন ঘটেনি, তবে বারবার ফিরে আসা এই কম্পনগুলো আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশ কতটা ভঙ্গুর। আপাতত রাজ্যজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং সবাই একটি শান্ত ও নিরাপদ ভোরের প্রতীক্ষায় রয়েছে।

এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ:

  • মোট কম্পনের সংখ্যা: ১৩ বার।

  • সময়কাল: শুক্রবার মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত (সাড়ে চার ঘণ্টা)।

  • ক্ষয়ক্ষতি: কোনো প্রাণহানি বা বড় ধসের খবর নেই।

  • প্রভাবিত এলাকা: গ্যাংটক, মঙ্গন, নামচি এবং উত্তর সিকিমের একাংশ।

  • প্রশাসনের পদক্ষেপ: রাজ্যজুড়ে হাই অ্যালার্ট জারি ও কুইক রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার