জাতীয় ফিচার

র‍্যাব এখন ইতিহাস: আত্মপ্রকাশ করল ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’

দীর্ঘ দুই দশকের পথচলা শেষে বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়ল দেশের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত এলিট ফোর্স র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। বাহিনীটির নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ (এসআইএফ)। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা জানান।

এক নজরে মূল পরিবর্তনসমূহ:

  • পূর্বতন নাম: র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।

  • নতুন নাম: স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স (এসআইএফ)।

  • ঘোষণা দাতা: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

  • কার্যকরী সময়: প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে দ্রুততম সময়ে এটি কার্যকর হবে।

সংস্কারের প্রেক্ষাপট

২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করা র‍্যাব গত দুই দশকে বহু দুর্ধর্ষ অপরাধী ও জঙ্গিবাদ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, গত কয়েক বছরে বাহিনীটির বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ক্রমাগত চাপের মুখে বাহিনীটির সংস্কার ছিল সময়ের দাবি।

সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “আমরা এই বাহিনীকে একটি জনবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। শুধুমাত্র নাম পরিবর্তন নয়, এর পোশাক, লোগো এবং কাজের ধরণেও আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হলো নাগরিকদের মনে ভয়ের পরিবর্তে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা।”

কোর কমিটির সভায় জানানো হয়, এসআইএফ মূলত সন্ত্রাসবাদ দমন, মাদক উদ্ধার এবং রাষ্ট্রের বিশেষ সংকটে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন’ হিসেবে কাজ করবে। তবে বাহিনীটির কার্যক্রম পরিচালনায় এখন থেকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রতিটি অভিযানের পর এখন থেকে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও প্রতিবেদন পেশ করা বাধ্যতামূলক করা হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

পেশাদারিত্ব ও নতুন কাঠামো

বিশ্লেষকদের মতে, র‍্যাবের নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে। তবে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, কেবল সাইনবোর্ড পরিবর্তন করলেই পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে না, বরং বাহিনীর মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন নিশ্চিত করা জরুরি।

নতুন গঠিত ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ (এসআইএফ) এর গঠনতন্ত্রে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে:

  • আইনি কাঠামো: এসআইএফ-এর জন্য নতুন কার্যবিধি (SOP) তৈরি করা হচ্ছে।

  • সদস্য নিয়োগ: পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত এই ফোর্সে সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে মানবাধিকার সচেতনতাকে মানদণ্ড হিসেবে দেখা হবে।

  • প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন: গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এসআইএফ-কে আরও আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে সজ্জিত করা হবে।

ভবিষ্যতের প্রভাব ও জনমত

সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ঘোষণা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ একে ইতিবাচক মনে করলেও অনেকের মতে, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে আইনি সংস্কার বেশি প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, বিগত সরকারের সময় ঘটা বিতর্কিত ঘটনাগুলোর দায় এই বাহিনী আর বহন করবে না। নতুন নামে এটি হবে সম্পূর্ণ নতুন চেতনার একটি ফোর্স।

সরকারের এই সাহসী পদক্ষেপটি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কতটুকু কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে নাম ও পরিচয়ের পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে একটি নতুন অধ্যায়ে পদার্পণ করছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এসআইএফ কি পারবে সাধারণ মানুষের বন্ধু হয়ে উঠতে? নাকি কেবল নামেই সীমাবদ্ধ থাকবে এই পরিবর্তন—এখন সেটাই দেখার বিষয়।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র