যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ অনুমোদন
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ-২০২৬-এর নীতিগত অনুমোদনসহ ১১টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে তেজগাঁওয়ের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সংস্কারে নতুন গতি যোগাবে।
এই বৈঠকটি অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এতে সমাজের দুর্বল অংশের সুরক্ষা থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পর্যন্ত বিস্তৃত বিষয়গুলোকে স্পর্শ করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত এই সরকার ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে সংস্কারমুখী পদক্ষেপ নিয়ে চলছে, এবং এই সিদ্ধান্তগুলো সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। বৈঠকের পর সচিবালয়ের একটি সূত্র জানায়, সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ-২০২৬ এই সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয়রানির শিকারদের জন্য কঠোর আইনি কাঠামো তৈরি করা হবে। অধ্যাদেশে প্রস্তাবিত হয়েছে, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করা, দোষীদের জন্য কঠোর শাস্তি নির্ধারণ এবং শিকারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে যৌন হয়রানির ঘটনা দিন দিন বাড়ছে, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে প্রায় ৬০ শতাংশ নারী কোনো না কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হন। এই অধ্যাদেশ এমন একটি সময়ে আসছে যখন সমাজে #MeToo-এর মতো আন্দোলনগুলো নতুন করে সচেতনতা তৈরি করেছে।
অধ্যাদেশের পটভূমিতে লক্ষণীয় যে, ২০০৯ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবায়ন ছিল অপর্যাপ্ত। এবারের অধ্যাদেশ সেই ফাঁকগুলো পূরণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু আইনি নয়, সামাজিক পরিবর্তনেরও একটি হাতিয়ার। উদাহরণস্বরূপ, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন থেকে বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দিতে হবে হয়রানি সংক্রান্ত, যা স্বচ্ছতা বাড়াবে। তবে চ্যালেঞ্জ রয়েছে—অধ্যাদেশের সফলতা নির্ভর করবে প্রয়োগের উপর, যেখানে প্রশাসনিক দুর্বলতা একটি বড় বাধা।
অন্যান্য সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সংস্কার এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠন উল্লেখযোগ্য। উপদেষ্টা পরিষদ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নতুন কর নীতি অনুমোদন করেছে, যা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়ক হবে। এছাড়া, শিক্ষা সংস্কারের অংশ হিসেবে জাতীয় পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈঠকে পরিবেশ সুরক্ষা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক নীতিমালাও আলোচিত হয়। এসব সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য—একটি স্বচ্ছ, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা—কে এগিয়ে নেবে।
সমাজকর্মীরা এই অধ্যাদেশকে স্বাগত জানিয়েছেন। নারী অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এটি নারীদের ক্ষমতায়নের একটি বড় পদক্ষেপ। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ সীমিত, তাই এসব সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে আগামী নির্বাচিত সরকারকে। বৈঠকের পর প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস একটি সংক্ষিপ্ত বার্তায় বলেন, “আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”





