অর্থ-বাণিজ্য ফিচার

ট্রাম্পের শুল্ক-আঘাতে ভারতের পোশাক শিল্পে ধস, সুবিধায় বাংলাদেশসহ প্রতিবেশীরা

ভারতে পুরনো শুল্কের সাথে নতুন যোগ হয়ে কিছু বোনা পোশাকের ক্ষেত্রে কার্যকরী হার ৬৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এতে এই পণ্যগুলোর মূল্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় কমপক্ষে ৩৫ শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে। প্রথমদিকে এটাকে মাত্র একটা বড় ধাক্কা ভাবা হয়েছিল, কিন্তু এখন রপ্তানিকারকরা এটাকে প্রকৃতপক্ষে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখছেন।

এই শুল্কের আঘাত এসেছে ঠিক তখন, যখন তামিলনাড়ুর টেক্সটাইল অঞ্চল আমেরিকান অর্ডার ফিরিয়ে আনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তিরুপুর, কোয়েম্বাটুর এবং করুর কারখানাগুলোতে ১২ লাখেরও বেশি শ্রমিক এই খাতে যুক্ত, এবং প্রতি বছর প্রায় ৪৫ হাজার কোটি রুপির পোশাক বিদেশে পাঠানো হয়।

কয়েক সপ্তাহ আগেও ভারতে আশার আলো দেখা যাচ্ছিল—যুক্তরাজ্যের সাথে ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট এবং চীন (১২৫ থেকে ১৪৫ শতাংশ) ও মিয়ানমারের (৪০ শতাংশ) ওপর আমেরিকার অতিরিক্ত শুল্কের কারণে মার্কিন ক্রেতাদের ভারতীয় পণ্যের প্রতি আকর্ষণ বাড়বে বলে ধারণা করা হয়েছিল। এই প্রত্যাশায় অনেক ব্যবসায়ী নতুন মেশিনে বিনিয়োগ করেছিলেন অতিরিক্ত চাহিদা মেটানোর জন্য।

কিন্তু সেই প্রত্যাশা এখন হতাশায় পরিণত হচ্ছে; বিশেষ করে প্রতিশোধমূলক শুল্কের চাপে—যেখানে চীনের হার এখন ৩০ শতাংশে নেমেছে এবং আমেরিকার সাথে চুক্তি হলে তা আরও কমতে পারে।

‘এটা একটা বিশাল আঘাত,’ বলেন তিরুপুর এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান কে এম সুব্রামানিয়ান। ছোটো রপ্তানি ফার্মগুলো প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্রেতারা ইতিমধ্যে আমাদের কিছু শুল্কের ভাগ নিতে বলছেন। আমাদের লাভের হার মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে এই খরচ কী করে সামলাবো?

প্রভাব শুধু পোশাকেই থেমে নেই। কোয়েম্বাটুর এবং করুর মতো অঞ্চলে গৃহস্থালি টেক্সটাইলের অর্ডারগুলো থমকে গেছে। সাউদার্ন ইন্ডিয়া মিলস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব কে সেলভারাজু জানান, বিছানার চাদর এবং তোয়ালের মতো পণ্য, যা সাধারণত অক্টোবরের মধ্যে অর্ডার পায়—তাদের গ্রীষ্মের বুকিং ক্রেতারা পিছিয়ে দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, যারা আগে অনুসন্ধান করেছিলেন, তারা এখন ‘অপেক্ষা করো’ বলছেন। সেলভারাজু আশঙ্কা করে বলেন, এই মৌসুম মিস করলে আমরা পুরো সিজন হারিয়ে ফেলবো।

করুর একাই বছরে প্রায় নয় হাজার কোটি রুপির গৃহস্থালি টেক্সটাইল বিদেশে পাঠায়, যার মধ্যে ৬ হাজার ৯০০ কোটি সরাসরি রপ্তানি। কোয়েম্বাটুরের ফ্যাক্টরিগুলো প্রচুর পরিমাণ তোয়ালে এবং রান্নাঘরের লিনেন আমেরিকায় পাঠায়। কিন্তু এখন তারা অতিরিক্ত শুল্কের চাপে ক্লান্ত।

‘এটা শুধু একবারের শুল্ক বাড়ানোর ব্যাপার নয়, এটা ইতিমধ্যে দুর্বল বাজারকে আরও জটিল করে তুলছে,’ বলেন সেলভারাজু। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের তুলার ওপর ১১ শতাংশ আমদানি শুল্ক এবং জিএসটি ইনভারশন প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে।

পলিয়েস্টার কাঁচামালে কর ১৮ শতাংশ, সুতোয় ১২ শতাংশ, কিন্তু তৈরি পোশাকে ৫ শতাংশ। এতে রপ্তানি খরচ ৬-৭ শতাংশ বেড়ে যায়, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীদের এমন কর ব্যবস্থা নেই, বলেন তিনি।

প্রতিদ্বন্দ্বীরা এগিয়ে যাচ্ছে

বিশ্ব টেক্সটাইল মার্কেটে প্রতিযোগিতা খুবই তীব্র; ভারতের মূল প্রতিযোগীরা এমন কঠোর শুল্কের সম্মুখীন হচ্ছে না। বাংলাদেশে আমেরিকার কার্যকর শুল্ক ৩৫-৩৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৯-২১ শতাংশ, ভিয়েতনামে ২০-২১ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ায়, যেখানে আগে ৪৯ শতাংশ ছিল—১ আগস্ট থেকে ১৯ শতাংশে নেমেছে। তুলনায় ভারতের ৫০ শতাংশ শুল্ক একেবারে অস্বাভাবিক এবং অভূতপূর্ব।

তিরুপুরের একজন ব্যবসায়ী স্বীকার করেন, তার চালানগুলো পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হয়েছে। ‘তারা নিশ্চয়ই ভালো দর দিয়েছে,’ তিনি বলেন। ‘অর্ডার হাতছাড়া হয়ে গেল।’

 

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার