“ভারতের আনুষ্ঠানিকভাবে জানার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ”
ভারত বাংলাদেশ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, পোশাকসহ প্রায় সাত ধরনের পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যা দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তবে, এ বিষয়ে ভারত সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল, যার মধ্যে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য এবং পোশাক ছিল অন্যতম। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে স্থলবন্দর-কেন্দ্রিক বাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পেট্রাপোল-বেনাপোল এবং ফুলবাড়ী-বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, “আমরা এখনো ভারতের পক্ষ থেকে কোনো সরকারি বিজ্ঞপ্তি পাইনি। তবে, বিষয়টি নিয়ে আমরা সজাগ রয়েছি। আনুষ্ঠানিকভাবে জানার পর কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।” তিনি ব্যবসায়ীদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকার এই সংকট মোকাবিলায় সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
ভারত গতকাল যে পদক্ষপটা নিলো সেই পরিপ্রেক্ষিতে আপনারা কী করছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, আমরা এখনো অফিসিয়ালি ভারতের পদক্ষেপের বিষয়ে কিছু জানি না। তবে সোস্যাল মিডিয়া ও নিউজ থেকে আমরা জানি তারা স্থলবন্দর বিশেষ করে আখাউড়া, ডাউকিসহ কিছু সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা ফর্মালি জানার পর ব্যবস্থা নিতে পারবো। আমাদের বিশ্লেষণ চলছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা সেটা করছে। আমরা উপলব্ধি করার চেষ্টা করছি, তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা করণীয় নির্ধারণ করবো।
আমরা ভারতের যে সিদ্ধান্তের কথা জানতে পারছি তাতে আমাদের বাণিজ্য বড় ধরনের প্রভাব পড়বে, বিশেষ করে গার্মেন্টস পণ্য, আসবাবপত্র, ফলের জুসসহ বিভিন্ন পণ্যে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমাদের দেশ থেকে খুব বেশি যে সবকিছু যায় তা কিন্তু না। গার্মেন্টস শিল্পের একটা বড় পরিমাণ যায়। আপনারা এটা জানেন যে প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জনই আমাদের বড় লক্ষ্য৷ এটা দুইজনের জন্য লাভজনক বিষয়। আমরা নিশ্চয়ই মনে করি ভারত নিজেও একটা টেক্সটাইল বা বস্ত্রশিল্পে সমৃদ্ধ দেশ। এরপরও যখন আমাদের দেশ থেকে এসব পণ্য রপ্তানি হয় সেটা আমাদের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই। তবে আমরা আশা করি উভয় দেশের ভোক্তা ও উৎপাদনের স্বার্থে এটা চলমান থাকবে।
এর আগেও ট্রান্সশিপমেন্ট, এখন রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা; এই দুইটা বিষয় ভারত কেন করেছে বলে আপনি মনে করেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে উপদেষ্টা বলেন, ট্রান্সশিপমেন্টের প্রভাব আমাদের নেই। আমরা নিজেদের সক্ষমতা ব্যবহার করে নিজস্বভাবেই এই সমস্যার সমাধান করেছি।
ভারতীয় ব্যবসায়ীরা কি এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে আপনার মনে হয়- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অবশ্যই, এটাতো প্রতিযোগিতার সক্ষমতার বিষয়। বিভিন্ন সময় আপনারা দেখেছেন আমরা যেহেতু ভৌগোলিকভাবে কানেক্টেড একটা দেশ। আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা, পরিবহন ব্যয়সহ অন্যান্য জিনিস নির্দিষ্ট। এক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন সময় আমাদের কৃষিপণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করি, ভারতও করে। সেটা চলমান একটা প্রক্রিয়া। এটা বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া আমরা সেটা বিষয়ে কাজ করছি। সেখানে যদি সমস্যা দেখা দেয় বা তৈরি হয় তাহলে উভয়পক্ষ আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করবো।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমাদের বেশ কিছু বন্দর এখনো চালু আছে। যে কয়টা বন্ধ হয়েছে সেখানে ৯০ শতাংশ নয়। আমাদের সংস্থাগুলো কাজ করছে। আমি এখনো রিপোর্টটা দেখিনি। আপনারা যেমন সোস্যাল মিডিয়াতে দেখেছেন আমিও সোস্যাল মিডিয়ায় দেখেছি। আমাদের আরও দু-একদিন সময় লাগবে পুরো পরিস্থিতিটা জানার জন্য আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি। আজ না হয় কালের মধ্যে তথ্য পেয়ে যাবো, তখন আমরা আরও ভালোভাবে জানতে পারবো।
বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা এই নিষেধাজ্ঞাকে ‘অপ্রত্যাশিত’ আখ্যা দিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রসেসড ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, “ভারত আমাদের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বড় বাজার। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই নিষেধাজ্ঞার পেছনে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার সুরক্ষা এবং স্থানীয় শিল্পকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে, এটি দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গত বছর বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১২ শতাংশ গিয়েছিল ভারতে, যার বেশিরভাগই স্থলবন্দরের মাধ্যমে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং ভারতের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পরিকল্পনা করছে। এই সংকট দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।





