৪৫তম বিসিএসের গেজেট দীর্ঘ ১০ মাসেরও বেশি সময় প্রতীক্ষার পর অবশেষে প্রকাশিত হলেও তা ঘিরে চরম অসন্তোষ এবং বড় ধরণের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) কর্তৃক চূড়ান্তভাবে সুপারিশকৃত ১ হাজার ৮০৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০৫ জনের নাম শেষ মুহূর্তে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত গেজেট থেকে বাদ পড়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট বা যৌক্তিক কারণ ছাড়াই এভাবে শেষ মুহূর্তে তালিকা থেকে ছিটকে পড়ায় বাদ পড়া প্রার্থীরা চরম ক্ষোভ ও হতাশায় ফেটে পড়েছেন। সম্প্রতি এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আগামী সাত দিনের মধ্যে যদি তাদের অন্তর্ভুক্ত করে সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করা না হয়, তবে তারা একযোগে প্রকাশ্য রাজপথে ‘আত্মাহুতি’র মতো আত্মঘাতী পথ বেছে নিতে বাধ্য হবেন।
এক নজরে মূল ঘটনা ও সংকটসমূহ:
-
- চূড়ান্ত গেজেট: বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৪৫তম বিসিএসের প্রজ্ঞাপন জারি করে।
- প্রার্থীর সংখ্যা: পিএসসি ১,৮০৭ জনকে সুপারিশ করলেও গেজেটে স্থান পেয়েছেন ১,৭০২ জন প্রার্থী।
- বঞ্চনার শিকার: কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই তালিকা থেকে সরাসরি বাদ পড়েছেন ১০৫ জন যোগ্য প্রার্থী。
- চরম আলটিমেটাম: সাত দিনের মধ্যে সমাধান না হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে গণ-আত্মাহুতির ঘোষণা।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান নাকি বঞ্চনার নতুন অধ্যায়?
বিগত ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে শুরু হওয়া ৪৫তম বিসিএসের দীর্ঘ চার বছরের নিয়োগ প্রক্রিয়া গতকাল রাতের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শেষ ধাপে পৌঁছায়। তবে দীর্ঘ ৩২২ দিন অপেক্ষা করার পর যখন গেজেট এলো, তখন ১০৫ জন মেধারী শিক্ষার্থীর জীবনে নেমে এলো ঘোর অন্ধকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রশাসন ও পুলিশসহ বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের তালিকায় অনেকেরই নাম নেই। এই বঞ্চনার শিকার প্রার্থীরা জানান, তারা প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং ভাইভা পরীক্ষার মতো কঠিন সব ধাপ পেরিয়ে মেধার জোরে পিএসসির চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন।
তদন্ত ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের (ভেরিফিকেশন) নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ তোলা হয়। অনেক শিক্ষার্থীর পারিবারিক বা অতীত রাজনৈতিক পরিচয়ের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনগড়া প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বলে তাদের দাবি। অথচ সদ্য সমাপ্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও এই বাদ পড়া প্রার্থীদের অনেকেই সক্রিয়ভাবে রাজপথে লড়াই করেছিলেন বলে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।
‘আত্মাহুতি’র মতো চরম হুঁশিয়ারির নেপথ্যে যে যন্ত্রণা
চাকরি না পাওয়ার যন্ত্রণা এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার গ্লানি সহ্য করতে না পেরেই প্রার্থীরা এমন কঠোর আলটিমেটাম দিয়েছেন। কান্নায় ভেঙে পড়ে একজন চাকরিপ্রার্থী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “চার বছর ধরে দিন-রাত এক করে পড়াশোনা করে ক্যাডার পদে সুপারিশ পেয়েছিলাম। বাড়ি-ঘর, আত্মীয়-স্বজন সবাই জানে আমি ক্যাডার হয়েছি। এখন যদি বিনা কারণে এই ৪৫তম বিসিএসের গেজেট থেকে আমার নাম বাদ দেওয়া হয়, তবে সমাজে মুখ দেখানোর আর কোনো জায়গা থাকবে না।”
শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, তাদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। তারা কোনো বিশেষ সুযোগ বা সুবিধা চাচ্ছেন না, বরং মেধার ভিত্তিতে পাওয়া নিজেদের ন্যায্য অধিকার ফেরত চাচ্ছেন। যদি রাষ্ট্র তাদের এই নীরব কান্নার ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে নিজেদের জীবন বিসর্জন দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় তারা দেখছেন না।
পিএসসি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের রহস্যজনক নীরবতা
পিএসসি ১ হাজার ৮০৭ জন প্রার্থীকে শতভাগ যাচাই-বাছাই করেই সরকারের কাছে তালিকা পাঠিয়েছিল। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কোন আইনি ক্ষমতাবলে বা কিসের ভিত্তিতে ১০৫ জন প্রার্থীকে এক ঝটকায় বাদ দিয়ে দিল, সে বিষয়ে সরকারি কোনো দপ্তরেই স্পষ্ট জবাব মিলছে না। এই প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও অস্বচ্ছতা সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের মাঝে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
বঞ্চিত প্রার্থীরা ইতিমধ্যেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং পিএসসি চেয়ারম্যান বরাবর স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। তারা দাবি করেছেন, যদি কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রদ্রোহী বা ফৌজদারি অপরাধের মামলা না থাকে, তবে তাকে কোনো অবস্থাতেই গেজেট থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। এই বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপও কামনা করেছেন তারা।
আন্দোলনের রূপরেখা ও রাজপথের প্রস্তুতি
আগামী সাত দিন তারা শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ এবং নিজেদের দাবি আদায়ের চেষ্টা চালাবেন। তবে এই সময়ের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়া গেলে তারা কঠোর আন্দোলনে যাবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ দেশের প্রধান প্রধান প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
একটি মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্ন ছাত্র-জনতা দেখেছে, সেখানে মেধার এমন অবমূল্যায়ন কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। এখন দেখার বিষয়, ১০৫ জন মেধাবী তরুণ-তরুণীর এই জীবনবাজি রাখার আলটিমেটামের পর সরকার তাদের দাবি পূরণে কী ধরণের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে।