ফিচার বিশ্ব সংযোগ

হাসিনার আমলের ১০১ চুক্তি পর্যালোচনার খবরে ভারতের প্রতিক্রিয়া

রণধীর জয়সোয়াল-newsedge24

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত ১০১টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসন—এমন খবরের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত জানিয়েছে, নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে তারা।

শুক্রবার নয়াদিল্লিতে দ্বিসাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব প্রতিবেদন নয়াদিল্লির নজরে এসেছে। তবে ঢাকার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরাও এ বিষয়ে কিছু গণমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখেছি। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। অবশ্যই, ভারত তার স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।’

শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে স্বাক্ষরিত প্রায় ১০১টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করছে বর্তমান প্রশাসন। বাংলাদেশি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাধ্যতামূলক নয় এমন সমঝোতা স্মারক এবং অবকাঠামো-সংক্রান্ত শর্তগুলো জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিশ্চিত করতেই এই পর্যালোচনা চলছে। তবে সব চুক্তি একসঙ্গে বাতিলের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। প্রতিটি প্রকল্প আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

আগের চুক্তির আওতায় ভারতকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে স্থলবেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এখন বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ এসব পণ্য পরিবহনের মাশুল ও রুট ব্যবহারের সুবিধা পর্যালোচনা করছে। তাদের যুক্তি, আগের শর্তগুলো ভারসাম্যপূর্ণ ছিল না। রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনার কারণে পুরোপুরি এই সুবিধা বাতিলের সম্ভাবনা কম হলেও খরচ পুনর্গঠন বা প্রশাসনিক বিলম্ব ভারতের পরিবহন ব্যয় বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশ আমদানিকৃত বিদ্যুতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ভারতের আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আন্তঃসীমান্ত ডিজেল পাইপলাইনও এর অন্তর্ভুক্ত। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির অর্থ পরিশোধে বিলম্ব এবং আর্থিক শর্ত পুনর্নির্ধারণের অনুরোধের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিক জ্বালানি চাহিদার কারণে পুরো চুক্তি বাতিলের সম্ভাবনা কম।

হাসিনার শাসনামলে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় ভারতবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়া নিয়মিতভাবে প্রত্যাখ্যান করা হতো। সীমান্ত নিরাপত্তা সহযোগিতা এখনো কার্যকর রয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে কিছু অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সীমান্তপথে চোরাচালান, অবৈধ অভিবাসন এবং ভারতবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর পুনরুত্থান ঠেকাতে নয়াদিল্লি এখনো বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নির্ভর করছে।

বাংলাদেশের রেল, সড়ক ও বন্দর প্রকল্পে ভারত ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ সহায়তা দিয়েছে। এসব প্রকল্পের কয়েকটি—যেমন আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়ক সম্প্রসারণ—এখন ঢাকার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আওতায় রয়েছে। বিলম্ব, বরাদ্দ না হওয়া অর্থ বাতিল বা ক্রয়সংক্রান্ত শর্তে পরিবর্তন হলে ভারতীয় অর্থায়ন বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ঢাকা এমন এক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে চাইছে, যা ‘ভারতকেন্দ্রিক’ অবস্থান থেকে সরে এসে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে আরও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। নয়াদিল্লি যোগাযোগের পথ খোলা রেখে বাস্তবভিত্তিক অবস্থান নিয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকার সীমান্ত সরবরাহ, জ্বালানি চুক্তি ও প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত বিষয়গুলো কীভাবে পরিচালনা করছে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

আরও পড়ুন:  ভারতের সঙ্গে ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার: চিফ হুইপ

এদিকে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়ে জয়সওয়াল বলেন, দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো কার্যকর রয়েছে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত এ চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে পানি-সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে তিনি জানান।

তিস্তা ও অন্যান্য অভিন্ন নদীর বিষয়েও ভারতের অবস্থান স্পষ্ট। দুই দেশ ৫৪টি নদী ভাগাভাগি করে। পানি-সংক্রান্ত সব সহযোগিতা ও আলোচনা দ্বিপক্ষীয় যৌথ নদী কমিশন এবং বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমেই হওয়ার কথা। ২০১১ সালে প্রস্তাবিত তিস্তা চুক্তিতে পানির ৪২.৫ শতাংশ ভারতের এবং ৩৭.৫ শতাংশ বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দের কথা বলা হয়েছিল। তবে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধিতায় তা বাস্তবায়িত হয়নি।

এর আগে ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত ১০১টি চুক্তি বর্তমান সরকার পর্যালোচনা করছে। দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো শর্ত আছে কি না, তা গভীরভাবে যাচাই করে শিগগির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ১৩ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও বলেন, এসব স্মারক ও চুক্তি সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার