অন্যান্য ফিচার বিশ্ব সংযোগ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব ধরনের পরোক্ষ শান্তি আলোচনা স্থগিত করল ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব ধরনের পরোক্ষ শান্তি আলোচনা স্থগিত করল ইরান

লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘনের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সব ধরনের পরোক্ষ শান্তি আলোচনা স্থগিত ঘোষণা করেছে ইরান। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছিল, তা আপাতত পুরোপুরি বন্ধ থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

তেহরানের কঠোর সিদ্ধান্ত ও পটভূমি

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের টানাপোড়েনের মধ্যে সোমবার (১ জুন) ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা ‘তাসনিম’ এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি সামনে এনেছে। ওমানসহ কয়েকটি তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পর্দার আড়ালে এক ধরনের সংলাপ সচল ছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সুতোও ছিঁড়ে গেল।

ইরানের নীতি-নির্ধারকদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ক্রমাগত হামলা এবং নির্বিচারে সাধারণ নাগরিক হত্যার ঘটনাকে তেহরান অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যেকোনো আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির অন্যতম প্রধান ও অবিচ্ছেদ্য শর্ত ছিল লেবানন সীমান্তকে অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু সেই শর্তকে তোয়াক্কা না করে সব ফ্রন্টে আগ্রাসন অব্যাহত রাখায় ইরানের আলোচনাকারী দল এই চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে একটি শক্ত বার্তা দিতে চাইল। যেহেতু ইসরায়েলের মূল সামরিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তাই লেবাননে হামলার দায় কোনোভাবেই ওয়াশিংটন এড়াতে পারে পারে না—এমনটাই মনে করছে তেহরানের প্রশাসন। নথিপত্র বিনিময় বন্ধের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও এক ধাপ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিল।

আলোচনার অচলাবস্থা:

এই আকস্মিক কূটনৈতিক অচলাবস্থার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ ও প্রেক্ষাপট উঠে এসেছে, যা নিচে তুলে ধরা হলো:

  • লেবাননে ক্রমাগত আগ্রাসন: লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বাহিনীর চলমান সামরিক অভিযান এবং ব্যাপক জানমালের ক্ষয়ক্ষতি এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

  • যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ: শান্তি আলোচনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল সামগ্রিক অঞ্চলের যুদ্ধবিরতি। কিন্তু সব ফ্রন্টে ইসরায়েলের আগ্রাসী অবস্থান সেই সমঝোতাকে ভেস্তে দিয়েছে।

  • কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন: তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতায় এতদিন ধরে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে যে খসড়া চুক্তি ও নথিপত্র বিনিময় চলছিল, তা এখন সম্পূর্ণ হিমাগারে চলে গেল।

ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনীতি

ইরানের এই কঠোর অবস্থান বিশ্ব রাজনীতির জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওমানের মতো দেশগুলো যারা দুই বৈরী দেশের মধ্যে সেতু বন্ধনের কাজ করছিল, তাদের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাও এখন বড় ধরনের ধাক্কা খেল। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে হোয়াইট হাউস যে এই পদক্ষেপে বেশ চাপে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য।

পরিশেষে, ওয়াশিংটন-তেহরান সংলাপের এই আকস্মিক সমাপ্তি কেবল দুটি দেশের দ্বিপাক্ষিক বিষয় নয়, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিশ্চিত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। লেবানন ও গাজা উপত্যকায় যদি দ্রুত স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হয়, তবে এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হবে। বিশ্ব সম্প্রদায় এখন গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে, আগামী দিনগুলোতে মার্কিন প্রশাসন এবং ইরানের এই বিপরীতমুখী অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতির জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক সুরক্ষায় কতটা গভীর ক্ষত তৈরি করে।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার