অর্থ-বাণিজ্য ফিচার

দীর্ঘ পতনের পর ঘুরে দাঁড়াচ্ছে রিজার্ভ, ৪৩ মাসের নতুন রেকর্ড

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) থেকে বাজেট সহায়তা হিসেবে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়ার পর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, রবিবার দেশের গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে, যা গত ৪৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। নতুন এডিবি ঋণের অর্থ যুক্ত হওয়ায় রিজার্ভ আবারও ৩৫ বিলিয়ন ডলারের ঘর পেরিয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কয়েক দফা রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল, কিন্তু বর্তমান অবস্থানটি সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বলে মনে করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত বিপিএম৬ হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ীও রিজার্ভের ইতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে। এ হিসাবে রবিবার দেশের রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলারে। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করল।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের জুন থেকে আইএমএফের এই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে রিজার্ভের তথ্য প্রকাশ শুরু করে। সে সময় বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ২৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো এ হিসাব পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। এরপর ধারাবাহিক উন্নতির মধ্য দিয়ে তা এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

তবে দেশের রিজার্ভের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অবস্থান ছিল ২০২১ সালের আগস্টে। সে সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছিল। পরবর্তীতে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের চাহিদা, অর্থপাচারের অভিযোগ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে। একই সময়ে ডলারের বিনিময় হারও ৮৪ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকার বেশি হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় গ্রস রিজার্ভ নেমে আসে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে। বিপিএম৬ হিসাব অনুযায়ী তা আরও কমে দাঁড়িয়েছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। সেই নিম্ন অবস্থান থেকে বর্তমান পুনরুদ্ধারকে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকদের মতে, রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম বড় ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয়। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে থাকে। চলতি অর্থবছরের ১০ জুন পর্যন্ত দেশে মোট ৩৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৫০ কোটি ডলার বা ১৯ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি। এর আগের অর্থবছরেও রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ।

রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ, বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড় এবং আমদানি ব্যয়ের তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এখন স্বস্তির বার্তা মিলছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধারা ধরে রাখতে হলে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে আরও প্রণোদনা এবং আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

দীর্ঘ পতনের পর রিজার্ভের এই পুনরুদ্ধার দেশের বহিঃখাত ব্যবস্থাপনায় আস্থার নতুন ভিত্তি তৈরি করবে বলেই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিবেদক

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার