জুলাইয়ের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না: ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি
মতের অমিল গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিষয় হলেও দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। তিনি বলেছেন, জাতীয় অগ্রযাত্রা যেন কোনো বিভাজন বা সংকীর্ণ স্বার্থের কারণে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত জুলাই শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, মহান জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস জাতির ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়। ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে এবং দেশের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়।
তিনি এই আন্দোলনে প্রাণ উৎসর্গকারী আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ইয়ামিন, ফারহান, নাফিজ, সজল, রাব্বি, মেরাজ, এলেম, তাইম, নাইমা, রিয়া গোপ, আহাদসহ সব শহিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করবে।
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক তুলে ধরে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যেমন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ছিল, তেমনি জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াই। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ এবং গণতন্ত্র টিকে থাকলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বও সুরক্ষিত থাকবে।
জুলাই শহিদ পরিবার ও আহতদের কল্যাণকে সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা প্রাণ দিয়েছেন কিংবা আহত হয়ে দৃষ্টিশক্তি বা অঙ্গ হারিয়েছেন, তাদের যথাযথ সম্মান, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। অনুষ্ঠানে এক দৃষ্টিশক্তি হারানো তরুণকে দেখে আবেগাপ্লুত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব মানুষকে প্রাপ্য সম্মান পেতে যদি দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তবে তা জাতির জন্য লজ্জার।
জুলাই যোদ্ধাদের উদ্দেশে তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে এবং সরকারের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো হবে। একই সঙ্গে তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নির্বাচিত সরকার কোনো ভুল করলে তা গঠনমূলকভাবে ধরিয়ে দিতে হবে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, অতীতের নানা অন্যায়, গুম, হত্যা, নির্যাতন ও দুর্নীতির জন্য দলটির মধ্যে অনুশোচনার অভাব রয়েছে। পাশাপাশি দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়া পলাতক ফ্যাসিস্ট নেতার বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন তিনি।
নিজের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তুলে ধরে ৮২ বছর বয়সী হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ২৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, আর এখন জীবনের এই পর্যায়েও সুশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে দেশের মানুষের পাশে থাকতে চান।
তিনি বলেন, আবু সাঈদের মতো বুক চিতিয়ে অন্যায়ের সামনে দাঁড়ানোর সাহস খুব কম জাতিরই আছে। সেই আত্মত্যাগকে ধারণ করেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। ঐক্য, দেশপ্রেম, সততা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে শহিদদের স্বপ্নের একটি মানবিক, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠান শেষে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধাদের প্রতিনিধিদের হাতে সম্মাননাসূচক ক্রেস্ট তুলে দেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য এবং জুলাই যোদ্ধাদের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।





