জীবনযাপন ফিচার

চুলে তেল দিলে কারও মাথা গরম, কারও ঠান্ডা, এর নেপথ্যে কী?

চুলে তেল দিলে কারও মাথা গরম, কারও ঠান্ডা, এর নেপথ্যে কী?

চুলে তেল মালিশ বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেউ এটি করেন চুলের যত্নে, কেউবা মানসিক প্রশান্তির আশায়। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, একই তেল ব্যবহারে কারও মাথায় শীতল আমেজ অনুভূত হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে দেখা দেয় অস্বস্তিকর গরম ভাব।

অনুভূতির ভিন্নতা: কেন এই বৈপরীত্য?

চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মাথায় তেল দেওয়ার পর অনুভূতির এই তারতম্য মূলত স্ক্যাল্প বা মাথার ত্বকের রক্ত সঞ্চালনের ওপর নির্ভর করে। যখন আমরা মাথায় তেল মালিশ করি, তখন আঙুলের ঘর্ষণে ওই স্থানের রক্তনালীগুলো প্রসারিত হয়। এর ফলে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, যা সাময়িকভাবে তাপ উৎপন্ন করতে পারে। যাদের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল, তারা এই তাপকে ‘মাথা গরম হওয়া’ হিসেবে অনুভব করেন।

অন্যদিকে, তেলের নিজস্ব কিছু ভৌত ও রাসায়নিক গুণাগুণ রয়েছে। নারকেল তেল বা আমলকীর তেল প্রাকৃতিকভাবেই শীতলকারক। এই তেলগুলো যখন মাথার ত্বকের সংস্পর্শে আসে, তখন তা বাষ্পীভবনের মাধ্যমে ত্বকের উপরিভাগের তাপ শুষে নেয়, ফলে এক ধরনের আরামদায়ক শীতল অনুভূতি তৈরি হয়।

আয়ুর্বেদ ও শারীরিক প্রকৃতির ভূমিকা

প্রাচীন চিকিৎসাবিদ্যা বা আয়ুর্বেদ শাস্ত্র এই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে শরীরের ‘পিত্ত’ এবং ‘কফ’ এর ভারসাম্য দিয়ে। যাদের শরীরে পিত্তের আধিক্য বেশি, তাদের মাথায় সামান্য ঘর্ষণে বা ভুল তেলের ব্যবহারে দ্রুত তাপ উৎপন্ন হয়। বিপরীতে, কফ বা বাত প্রকৃতির মানুষের ক্ষেত্রে তেল মালিশ স্নায়ুকে শিথিল করে এবং শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।

এছাড়া, তেলের ঘনত্বের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। ক্যাস্টর অয়েল বা সরিষার তেলের মতো ভারী তেলগুলো মাথার ত্বকের লোমকূপ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে পারে। এতে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপ বাইরে বের হতে বাধা পায়, যা মাথা গরম হওয়ার অন্যতম কারণ।

তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে মনে রাখার মতো কিছু তথ্য

মাথায় তেল দেওয়ার সময় বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়াতে বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু পরামর্শ দিয়ে থাকেন:

  • তেলের নির্বাচন: গরমকালে নারকেল বা তিল তেল ব্যবহার করা শ্রেয়, কারণ এগুলোর শীতল করার ক্ষমতা বেশি। অন্যদিকে শীতকালে সরিষার তেল বা অলিভ অয়েল আরামদায়ক হতে পারে।

  • মালিশের ধরণ: খুব জোরে ঘষে মালিশ করলে ঘর্ষণজনিত তাপ তৈরি হয়। হালকা হাতে আঙুলের ডগা দিয়ে চক্রাকারে মালিশ করা সবচেয়ে কার্যকর।

  • সময়কাল: দীর্ঘক্ষণ তেল লাগিয়ে রাখা অনেকের ক্ষেত্রে মাথাব্যথা বা সাইনাসের সমস্যা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যাদের মাথা দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়, তাদের ক্ষেত্রে ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা তেল রাখাই যথেষ্ট।

  • সংকর তেলের প্রভাব: বাজারে প্রচলিত সুগন্ধি তেলগুলোতে অনেক সময় কর্পূর বা মেন্থল মেশানো থাকে। এগুলো সাময়িকভাবে খুব ঠান্ডা অনুভূতি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে স্ক্যাল্পের প্রাকৃতিক পিএইচ (pH) ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

বিশেষজ্ঞ মত ও সতর্কতা

পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকদের মতে, কেবল বাহ্যিক অনুভূতিই শেষ কথা নয়। যদি তেল দেওয়ার পর কারও তীব্র মাথা ঘোরা, জ্বালাপোড়া বা র‍্যাশ দেখা দেয়, তবে বুঝতে হবে ওই নির্দিষ্ট তেলের উপাদানে তার অ্যালার্জি রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, “মাথা গরম বা ঠান্ডা হওয়া কেবল একটি তাৎক্ষণিক শারীরিক সংকেত। এটি ভয়ের কিছু নয়, বরং আপনার শরীরের মেটাবলিজম এবং ত্বকের সংবেদনশীলতার বহিঃপ্রকাশ।”

পরিশেষে বলা যায়, চুলে তেল দেওয়া কেবল রূপচর্চা নয়, এটি একটি বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়া। আপনার শরীর কোন ধরনের তেলে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে, সেটি বুঝে নেওয়া জরুরি। কারও জন্য যা প্রশান্তি, অন্যের জন্য তা অস্বস্তির কারণ হতে পারে—এটাই প্রকৃতির নিয়ম। তাই নিজের শরীরের প্রকৃতি বুঝে সঠিক তেল ও সঠিক মালিশ পদ্ধতি বেছে নিলে এই প্রাচীন অভ্যাসটি হয়ে উঠতে পারে আধুনিক সুস্থতার অন্যতম হাতিয়ার।

তেল দেওয়ার পর যদি আপনার মাথা অতিরিক্ত গরম অনুভূত হয়, তবে মালিশের সময় কমিয়ে দিন এবং ভারী তেলের বদলে হালকা তেলের দিকে ঝুঁকুন। সুস্থ চুলের পাশাপাশি সুস্থ অনুভবের ভারসাম্য বজায় রাখাই হোক মূল লক্ষ্য।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার