ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

স্থলবন্দরে বাংলাদেশের পণ্যে ভারতের নিষেধাজ্ঞা: রপ্তানিতে বড় ধাক্কা

ভারত সরকার বাংলাদেশ থেকে স্থলবন্দরের মাধ্যমে পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, ফল, কার্বনেটেড পানীয়, তুলা, প্লাস্টিক পণ্য এবং কাঠের আসবাবসহ প্রায় সাত ধরনের পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড (ডিজিএফটি) গত ১৭ মে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যা অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে, বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও পোশাক খাতে, মারাত্মক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শুধুমাত্র কলকাতা এবং মুম্বাইয়ের নাভা শেভা সমুদ্রবন্দর দিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে পারবে। আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং পশ্চিমবঙ্গের চ্যাংরাবান্ধা ও ফুলবাড়ি স্থলবন্দরসহ কোনো স্থলবন্দরের মাধ্যমে এই পণ্য আমদানি করা যাবে না। তবে, মাছ, ভোজ্য তেল, এলপিজি এবং চূর্ণ পাথরের আমদানির উপর এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। এছাড়া, ভারত হয়ে নেপাল ও ভুটানে রপ্তানিকৃত বাংলাদেশি পণ্য এই বিধিনিষেধের আওতায় পড়বে না।

গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে প্রায় ১৫৭ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছিল, যার বড় অংশ ছিল পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বড় বাজার রয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি প্রচার ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ভারত বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বাজার, যার ৯৩ শতাংশই স্থলবন্দরের মাধ্যমে প্রবেশ করে।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ী নেতারা এই নিষেধাজ্ঞাকে ‘প্রতিশোধমূলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। গত এপ্রিলে বাংলাদেশ ভারত থেকে সুতা আমদানিতে স্থলবন্দরের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, যা ভারতীয় টেক্সটাইল শিল্পের জন্য বড় ধাক্কা ছিল। ভারতের এই পদক্ষেপকে সেই নিষেধাজ্ঞার জবাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, “ভারত আমাদের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও প্লাস্টিক পণ্যের বড় বাজার। এই নিষেধাজ্ঞা আমাদের রপ্তানি ব্যবসায় মারাত্মক ক্ষতি করবে।” তিনি উভয় দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) একজন প্রতিনিধি জানান, স্থলবন্দর বন্ধ হওয়ায় পোশাক রপ্তানির সময় ও খরচ বাড়বে, যা ভারতীয় আমদানিকারকদের জন্যও ক্ষতিকর। “এটি একটি অ-শুল্ক বাধা, যা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষতি করবে,” তিনি বলেন।

দক্ষিণ এশীয় নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মনে করেন, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা উভয় দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। তিনি বলেন, “বাণিজ্যে এই ধরনের বাধা দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে দুর্বল করে। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান জরুরি।”

এই নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে এসেছে। গত বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের পর থেকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে, এবং উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা ছাড়া পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ব্যবসা-বাণিজ্য

২৫০ কর্মীর অসুস্থতায় বন্ধ হওয়া অ্যাপলের প্রতিষ্ঠান চালু হচ্ছে

নিম্নমানের খাবার খেয়ে ২৫০ জন কর্মী অসুস্থ হওয়ার প্রায় ১ মাস পর চালু হতে যাচ্ছে অ্যাপলের পণ্য সরবরাহকারী ফক্সকনের চেন্নাই