শহীদ মিনারে জনস্রোত, শ্রদ্ধা ও শপথ!
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মানুষের ঢল নামে। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। অনেকেই ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গান গেয়ে স্মরণ করেন ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের।
ভোরের প্রথম প্রহর থেকেই সাদা-কালো পোশাকে, বুকে কালো ব্যাজ আর হাতে ফুল নিয়ে মানুষ আসতে শুরু করেন। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জনসমাগম বাড়তে থাকে। শহীদ মিনারের বেদিতে ফুল দিতে অপেক্ষমাণ মানুষের সারি প্রাঙ্গণ পেরিয়ে সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীরা দায়িত্ব পালন করেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দলবদ্ধভাবে এসে পুষ্পস্তবক অর্পণ করছেন। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও ব্যানার নিয়ে উপস্থিত হন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের নেতৃত্বে সারিবদ্ধভাবে শহীদ মিনারে প্রবেশ করেন। তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা আর মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার।
প্রাঙ্গণে একদিকে ফুলের স্তূপ উঁচু হচ্ছে, অন্যদিকে আবৃত্তি ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে আবেগঘন পরিবেশ। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’—এই গানটি যেন দিনটির আত্মা হয়ে উঠেছে। অনেককে চোখ মুছতে দেখা যায়, আবার কেউ কেউ সন্তানদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বোঝাচ্ছেন।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, ভাষা আন্দোলন কেবল ইতিহাসের অধ্যায় নয়, এটি আমাদের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি। তাই প্রতিবছর এখানে এসে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো তার কাছে দায়িত্বের অংশ। এক স্কুলশিক্ষক জানান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য হলো নতুন প্রজন্মকে ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে পরিচিত করা।
১৯৫২ সালের এই দিনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর গুলি চালানো হয়। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন। তাদের আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। পরবর্তীতে দিবসটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে, যা বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষার গুরুত্বকে নতুন মাত্রা দেয়।
নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রবেশপথে তল্লাশি, সিসিটিভি নজরদারি ও মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে শ্রদ্ধা জানাতে পারেন, সে জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
দুপুর গড়ালেও মানুষের আগমন থামেনি। কেউ ফুল দিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ সংগঠনের পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিচ্ছেন। পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে এক ধরনের গাম্ভীর্য ও সংহতির আবহ বিরাজ করছে।





