ফিচার স্বাস্থ্য

প্যারাসিটামল নিয়ে ভুল ধারণা কতটা বিপজ্জনক? অতিরিক্ত সেবনে ক্ষতিগ্রস্ত হবে লিভার

প্যারাসিটামল নিয়ে ভুল ধারণা কতটা বিপজ্জনক? অতিরিক্ত সেবনে ক্ষতিগ্রস্ত হবে লিভার

জ্বর, মাথাব্যথা বা শরীর ব্যথা হলেই অনেকের প্রথম ভরসা প্যারাসিটামল। সহজলভ্য ও তুলনামূলক নিরাপদ হওয়ায় বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে এটি বহুল ব্যবহৃত। তবে চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন—অতিরিক্ত বা ভুলভাবে প্যারাসিটামল সেবন করলে তা নীরবে লিভারের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

দৈনন্দিন জীবনে ছোটখাটো অসুস্থতায় মানুষ যে কয়েকটি ওষুধের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে, তার মধ্যে প্যারাসিটামল শীর্ষে। এটি জ্বর কমানো এবং হালকা থেকে মাঝারি ধরনের ব্যথা উপশমে কার্যকর। চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীর্ঘদিন ধরে এটি নিরাপদ ওষুধ হিসেবে বিবেচিত এবং অনেক দেশে এটি ‘ওভার দ্য কাউন্টার’ বা চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই কেনা যায়।

কিন্তু এই সহজলভ্যতাই অনেক সময় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যারাসিটামল নিরাপদ হলেও এর নির্দিষ্ট মাত্রা রয়েছে। সেই সীমা অতিক্রম করলে শরীরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে লিভারের ওপর।

প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

প্যারাসিটামল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধারণা হলো—এই ওষুধ যত খুশি খাওয়া যায় এবং এতে কোনো ক্ষতি নেই।

চিকিৎসকেরা বলছেন, এটি সম্পূর্ণ ভুল। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য নির্দিষ্ট দৈনিক সর্বোচ্চ ডোজ রয়েছে। সেই মাত্রার বেশি সেবন করলে লিভারে বিষক্রিয়া তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে তা স্থায়ী লিভার ক্ষতির কারণও হয়ে দাঁড়ায়।

আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, খালি পেটে প্যারাসিটামল খাওয়া ঠিক নয়। বাস্তবে প্যারাসিটামল খালি পেটে খেলে সাধারণত এর কার্যকারিতায় কোনো পরিবর্তন হয় না। তবে যাঁদের দীর্ঘদিনের গ্যাস্ট্রিক বা আলসারের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে খাবার পর ওষুধ সেবন করা তুলনামূলক নিরাপদ।

অনেকে আবার মনে করেন, প্যারাসিটামল খেলেই সঙ্গে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেতে হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটিও সঠিক নয়। কারণ, প্যারাসিটামল সাধারণত পাকস্থলীতে তেমন কোনো অ্যাসিডিটি বা জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে না, যা অনেক ব্যথানাশক ওষুধের ক্ষেত্রে দেখা যায়।

যেসব ওষুধের সঙ্গে প্যারাসিটামল খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অন্য ওষুধের সঙ্গে প্যারাসিটামল সেবন করলে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কিছু ওষুধের সঙ্গে এর প্রতিক্রিয়া লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের ওষুধগুলোর সঙ্গে প্যারাসিটামল ব্যবহারে সতর্ক থাকা জরুরি—

  • কিছু ঠান্ডা ও ফ্লুর ওষুধ: অনেক ঠান্ডা-কাশির সিরাপ বা ট্যাবলেটে আগে থেকেই প্যারাসিটামল থাকে। আলাদা করে আবার প্যারাসিটামল খেলে অজান্তেই অতিরিক্ত ডোজ হয়ে যেতে পারে।
  • অ্যালকোহল বা মদ্যপান: নিয়মিত মদ্যপানের সঙ্গে প্যারাসিটামল সেবন করলে লিভার ক্ষতির ঝুঁকি অনেকগুণ বাড়ে।
  • কিছু অ্যান্টি-টিউবারকুলোসিস ওষুধ: যক্ষ্মার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ লিভারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এর সঙ্গে প্যারাসিটামল যুক্ত হলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
  • দীর্ঘমেয়াদি ব্যথানাশক বা অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ওষুধ: এসব ওষুধ একসঙ্গে সেবনের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক নজরে

  • প্যারাসিটামল জ্বর ও হালকা ব্যথা কমাতে কার্যকর।
  • নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি সেবন করলে লিভার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
  • অনেক ঠান্ডার ওষুধে আগে থেকেই প্যারাসিটামল থাকে।
  • অ্যালকোহলের সঙ্গে প্যারাসিটামল সেবন ঝুঁকিপূর্ণ।
  • দীর্ঘদিন বা নিয়মিত সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যারাসিটামল নিজে থেকে নিয়মিত বা অতিরিক্ত সেবনের অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই জ্বর বা ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু ওষুধ খেয়ে সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার