দেশজুড়ে চলমান তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত গরমে সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও শরীরে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা। চিকিৎসকেরা বলছেন, সচেতন খাদ্যাভ্যাস ও পর্যাপ্ত পানি গ্রহণই এ সময়ের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ডিগ্রি বেশি থাকায় শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ছেন। দীর্ঘ সময় রোদে থাকা, কম পানি পান করা এবং অতিরিক্ত গরমে শরীরের প্রয়োজনীয় লবণ বেরিয়ে যাওয়ার ফলে অনেকেই দুর্বল হয়ে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিটস্ট্রোক শুধু মাথা ঘোরা বা দুর্বলতার বিষয় নয়; এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে গেলে মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র ও কিডনির ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
পানিশূন্যতার প্রথম লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয় অতিরিক্ত ক্লান্তি, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব এবং পেশিতে টান। অনেকের ক্ষেত্রে হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়, প্রস্রাব কমে যায় এবং প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়। কোষ্ঠকাঠিন্যও দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘদিন এমন অবস্থা চলতে থাকলে কিডনিতে পাথর বা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছেন প্রবীণ ব্যক্তি, ছোট শিশু, হৃদ্রোগে আক্রান্ত রোগী এবং অতিরিক্ত ওজনের মানুষ। এ ছাড়া যারা বাইরে কাজ করেন—যেমন নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক, কৃষিশ্রমিক—তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ তারা দীর্ঘ সময় সরাসরি রোদ ও তাপের সংস্পর্শে থাকেন।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, এ সময়ে এমন খাবার বেছে নিতে হবে যা শরীরে অতিরিক্ত তাপ তৈরি করবে না। হালকা, সহজপাচ্য এবং পানিসমৃদ্ধ খাবার বেশি খাওয়া উচিত। ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ঘরে তৈরি ওরস্যালাইন, ফলের রস, তরমুজ, শসা, বাঙ্গি, কমলা, পেঁপে ও টকদই শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সহায়তা করে।
অন্যদিকে অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার, ভাজাপোড়া, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত চা-কফি এড়িয়ে চলাই ভালো। এসব খাবার শরীরে পানিশূন্যতা বাড়াতে পারে এবং তাপ উৎপাদনও বৃদ্ধি করে। খাবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত লবণ ও পানি গ্রহণ শরীরের ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গুরুত্বপূর্ণ করণীয়
- প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করুন
- বাইরে গেলে ছাতা, টুপি বা হালকা রঙের পোশাক ব্যবহার করুন
- দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অপ্রয়োজনে বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলুন
- ডাবের পানি, লেবুর শরবত ও ওরস্যালাইন পান করুন
- শিশু ও প্রবীণদের আলাদা নজরদারিতে রাখুন
- হঠাৎ জ্বর, অজ্ঞান হওয়া বা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপপ্রবাহ এখন আর মৌসুমি অস্বস্তি নয়; এটি একটি বড় স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমন পরিস্থিতি আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে। তাই শুধু সাময়িক সতর্কতা নয়, দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি।







