গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বলছে, তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রেকর্ড করা শিল্পী। প্রায় ১২ হাজারেরও বেশি গানের ঐশ্বর্য যাঁর ঝুলিতে, সেই সুরসম্রাজ্ঞী আশা ভোসলের কাছে তাঁর প্রিয় গান বেছে নেওয়া খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার শামিল। তবে দীর্ঘ সঙ্গীত সফরের ক্লান্তিহীন পথচলায় কিছু গান তাঁর হৃদয়ের বড্ড গভীরে রয়ে গেছে।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক সঙ্গীতের ইতিহাস আশা ভোসলেকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। লতা মঙ্গেশকরের ধ্রুপদী গাম্ভীর্যের সমান্তরালে আশা নিয়ে এসেছিলেন এক অদ্ভুত চপলতা, আধুনিকতা আর বহুমুখী কণ্ঠশৈলী। সম্প্রতি এক ঘরোয়া আলাপচারিতা এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের নির্যাস থেকে বেরিয়ে এসেছে তাঁর নিজের গাওয়া হাজার হাজার গানের মধ্য থেকে সেই বিশেষ কয়েকটি মণি-মুক্তো, যা তিনি নিজেও অবসরে গুনগুন করেন।
বৈচিত্র্যের কারিগর ও আর ডি বর্মন সংযোগ
আশার সঙ্গীত জীবনে রাহুল দেব বর্মন বা পঞ্চমের অবদান অনস্বীকার্য। আশার নিজের পছন্দের তালিকায় পঞ্চমের সুর করা ‘ইজাজত’ ছবির ‘মেরা কুছ সামান’ গানটি সবসময় শীর্ষে থাকে। গুলজারের লেখা এই গদ্যময় গানটিকে সুরে বাঁধা ছিল প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ। আশা মনে করেন, এই গানটি তাঁর গায়কীর এক অনন্য পরীক্ষা ছিল, যেখানে সুরের চেয়েও আবেগের সূক্ষ্ম কারুকাজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আবার ‘উমরাও জান’ ছবির সেই কালজয়ী গজলগুলোও তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। খৈয়ামের সুরে ‘ইন আঁখো কি মাস্তি কে’ বা ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’ গাইবার সময় আশা তাঁর চিরচেনা চটুল ইমেজ ভেঙে এক বিষণ্ণ ও অভিজাত সত্তাকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তিনি প্রায়ই বলেন, লতাদিদির ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের একটি স্বতন্ত্র জগত তৈরি করতে এই গানগুলো তাঁকে অক্সিজেন দিয়েছিল।
লোকজ সুর ও ধ্রুপদী ঘরানা
শুধু সিনেমার চটকদার গান নয়, আশা ভোসলের হৃদয়ের খুব কাছে আছে মারাঠি ভাবগীত এবং কিছু বাংলা গানও। আর ডি বর্মনের সুরে ‘চোখে চোখে কথা বলো’ বা ‘বড় একা লাগে’-র মতো বাংলা গানগুলোকে তিনি তাঁর সেরা কাজের মধ্যে গণ্য করেন। তাঁর মতে, বাংলা ভাষার মাধুর্য তাঁর কণ্ঠে এক অন্য মাত্রা যোগ করত।
ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকায় তিনি শচীন দেব বর্মনের সুরে ‘অভি না যাও ছোড়কর’ বা ও পি নায়ারের সেই দরাজ তালের গানগুলোকেও বিশেষ স্থান দেন। আশার ভাষায়, “প্রতিটি গান আমার কাছে এক একটি সন্তানের মতো, কিন্তু কিছু সন্তান যেমন একটু বেশি আদুরে হয়, এই গানগুলো ঠিক তেমনই।”
এক নজরে আশা ভোসলের প্রিয় কিছু গানের তালিকা:
-
মেরা কুছ সামান (ইজাজত): গদ্যধর্মী লিরিককে সার্থক রূপ দেওয়া।
-
ইন আঁখো কি মাস্তি কে (উমরাও জান): গজলের আঙিনায় নতুন পরিচয়।
-
আও হুজুর তুমকো (কিসমত): ক্লাসিক রোমান্টিক মেজাজ।
-
দম মারো দম (হরে রামা হরে কৃষ্ণা): তারুণ্যের উন্মাদনা ও আধুনিকতার প্রতীক।
-
পিয়া তু আব তো আজা (কারভান): কণ্ঠের কারুকার্যে এক অনন্য উচ্চতা।
সুরের শেষ নেই যেখানে
নয় দশকের এই মহাজীবন আজও সুরের নেশায় মত্ত। সাংবাদিক সম্মেলনে রসিকতা করে তিনি একবার বলেছিলেন, “আমি তো আজও শিখছি। প্রিয় গানের তালিকা প্রতিদিন বদলায়।” আসলে আশা ভোসলে মানেই এক বহুমুখী প্রতিভা, যিনি ভজন থেকে শুরু করে পপ মিউজিক—সবটাতেই স্বচ্ছন্দ। তবে তাঁর নিজের পছন্দের তালিকায় ঠাঁই পাওয়া গানগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি সর্বদা সেই কাজগুলোকেই উঁচুতে রেখেছেন যেখানে তাঁকে গায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি লড়াই করতে হয়েছে।







