বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) জানিয়েছে, নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে অতিরিক্ত কাজ বিশ্বজুড়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। তাদের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় কাজের কারণে প্রতি বছর লাখো মানুষ স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন।
আধুনিক কর্মসংস্কৃতিতে ‘ওভারটাইম’ যেন এক নতুন স্বাভাবিকতা। অফিসের নির্ধারিত ৮ ঘণ্টা শেষ হওয়ার পরও অনেক কর্মী কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন—কখনো চাপের কারণে, কখনো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রয়োজনে। কিন্তু এই অতিরিক্ত সময়ই নিঃশব্দে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
ডব্লিউএইচও ও আইএলওর প্রথম যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। ২০১৬ সালে দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং বিশ্বজুড়ে কর্মজীবীদের জন্য একটি গুরুতর সতর্কসংকেত।
বিশেষ করে যারা সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করেন, তাদের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গবেষণা অনুযায়ী, এই শ্রেণির কর্মীদের স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৫ শতাংশ বেশি এবং হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৭ শতাংশ বেশি, তুলনায় যারা সপ্তাহে ৩৫ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজ করেন। অর্থাৎ, অতিরিক্ত কাজ শুধু ক্লান্তিই বাড়ায় না, বরং জীবনহানির ঝুঁকিও বাড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় কাজের ফলে শরীরে ক্রমাগত চাপ (স্ট্রেস) তৈরি হয়, যা রক্তচাপ বাড়ায় এবং হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের অভাব শরীরের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি মারাত্মক রোগের দিকে ঠেলে দেয়।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই প্রবণতা আরও বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বেসরকারি খাত, বিশেষ করে কর্পোরেট অফিস ও কারখানাগুলোতে অতিরিক্ত কাজ প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। অনেক কর্মী চাকরি হারানোর ভয় বা পদোন্নতির আশায় নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ করতে বাধ্য হন। এতে একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়লেও অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে নীরবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক—উভয় পর্যায়ে সচেতনতা জরুরি। কর্মীদের জন্য নির্ধারিত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ছুটির সুযোগ দেওয়া, এবং কর্মপরিবেশকে মানবিক করা এখন সময়ের দাবি।







